শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) বকেয়া অর্থের ওপর সুদ পরিশোধের হার নিয়ে ফের আইনি লড়াইয়ে নেমেছে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন (জিপি)। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা পুরোনো একটি মামলা ২০২৩ সালে প্রত্যাহারের পর এবার বকেয়া অর্থের সুদের হিসাব নির্ধারণকারী শ্রম আইনের একটি বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছে কোম্পানিটি।
২০২৬ সালের ৫ জুলাই করা ওই রিটে জিপি শ্রম আইনের এমন একটি বিধান বাতিল বা সংশোধনের আবেদন জানিয়েছে, যেখানে ডব্লিউপিপিএফের বকেয়া অর্থের ওপর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে আদালতের কাছে বিকল্প হিসেবে ব্যাংক হারের চেয়ে ২৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি হারে সুদ নির্ধারণের আবেদন করা হয়েছে। জিপির আবেদন মঞ্জুর হলে সাবেক কর্মীদের দাবি করা সুদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বিরোধের শুরু ২০১১ সালে
গ্রামীণফোনের সঙ্গে সাবেক কর্মীদের ডব্লিউপিপিএফ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত ২০১১ সালে। টেলিকম অপারেটরদের বার্ষিক মুনাফার ৫ শতাংশ ডব্লিউপিপিএফে দেওয়ার জন্য ২০১০ সালে জারি করা সরকারি আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে সে সময় হাইকোর্টে যায় জিপি।
আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে কয়েক বছর টেলিকম খাতে মুনাফার এই অংশ কর্মীদের মধ্যে বণ্টনের বিষয়টি আইনি জটিলতায় আটকে থাকে।
এরপর ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধন করে মোবাইল টেলিকম অপারেটরদের ডব্লিউপিপিএফে অবদান রাখা বাধ্যতামূলক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে এই তহবিলের সুবিধাভোগীদের পরিধিও বাড়ানো হয়।
জিপির দাবি, আইন সংশোধনের পর থেকে তারা ডব্লিউপিপিএফ-সংক্রান্ত সব বাধ্যবাধকতা পালন করে আসছে এবং এ জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ডও গঠন করা হয়েছে।
২০২৩ সালে পুরোনো রিট প্রত্যাহার
জিপির পুরোনো রিটটি এক দশকের বেশি সময় আদালতে চলার পর ২০২৩ সালে কোম্পানিটি স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়। সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, বকেয়া অর্থের ওপর আইন অনুযায়ী সুদ পরিশোধের দায় এড়াতেই মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
মামলা প্রত্যাহারের পর এক হাজারের বেশি সাবেক কর্মী শ্রম আদালতে গিয়ে বকেয়া ডব্লিউপিপিএফ অর্থের ওপর আইনগত সুদ দাবি করার সুযোগ পান।
অন্যদিকে জিপির বক্তব্য, কর্মীদের সঙ্গে সমঝোতার পর পুরোনো রিটটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। আদালতের প্রক্রিয়াগত কারণে মামলা দীর্ঘদিন চলমান ছিল এবং সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পরই তা প্রত্যাহার করা হয়।
সুদের হার নিয়েই মূল বিরোধ
শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান ডব্লিউপিপিএফের অর্থ ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট দুটি হারের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে সুদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এর একটি হলো ব্যাংক হারের চেয়ে ২৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি; অন্যটি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ।
সাবেক কর্মীদের দাবি, ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালের যে অর্থ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে ছিল, তার ওপর উচ্চতর লভ্যাংশভিত্তিক সুদের হার প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তবে জিপির যুক্তি, বহু বছর আগের অর্থের ওপর লভ্যাংশভিত্তিক সুদের হার প্রয়োগ করলে কোম্পানির ওপর অস্বাভাবিক বড় আর্থিক দায় তৈরি হবে।
মূল অর্থ দেওয়া হলেও সুদ নিয়ে বিরোধ
পুরোনো রিট চলমান থাকার সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে জিপি ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি কর্মীকে ডব্লিউপিপিএফের মূল অর্থ পরিশোধ করেছে বলে কোম্পানিটির দাবি।
জিপির ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন কর্মী প্রতিনিধি সংগঠন গ্রামীণফোন পিপলস কাউন্সিলের (জিপিপিসি) সঙ্গে সমঝোতার পর অধিকাংশ যোগ্য কর্মী এমন অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে ভবিষ্যতে সুদের দাবি না করার কথা ছিল।
তবে সাবেক কর্মীরা এই ব্যাখ্যা মানছেন না। তাদের দাবি, ওই সমঝোতা ছিল মূল অর্থ গ্রহণের বিষয়ে; বছরের পর বছর অর্থ আটকে থাকার কারণে যে আইনগত সুদ পাওনা হয়েছে, তা তারা পরিত্যাগ করেননি।
সাবেক কর্মীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ২০১৫ সালেই যদি বিষয়টি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, তাহলে জিপি কেন ২০২৩ সাল পর্যন্ত রিট চালিয়ে গেল।
দাবির অঙ্ক নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান
বিরোধটি এখন দেশের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য আর্থিক দাবিগুলোর একটি হিসেবে সামনে এসেছে।
সাবেক কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ‘গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্বিত বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর দাবি, লভ্যাংশভিত্তিক সুদের হিসাব করা হলে প্রায় ৪ হাজার সাবেক কর্মীর প্রত্যেকের পাওনা ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। পরিষদটির হিসাবে মোট দাবির অঙ্কও বিপুল।
পরিষদের যোগাযোগ সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরী দাবি করেছেন, কর্মীরা দাবির ৯৯ শতাংশ ছেড়ে দিলেও অবশিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
তবে গ্রামীণফোন এই হিসাবের ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করেছে।
‘আইনি কৌশলে বিলম্ব’ অভিযোগ
সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের পাওনা আদায়ের পথ জটিল করে রাখা হয়েছে। নতুন রিটও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে দাবি তাদের।
আদিবা জেরিন চৌধুরীর ভাষায়, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে কর্মীরা দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তার অভিযোগ, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির বদলে বিষয়গুলো দীর্ঘদিন অমীমাংসিত রাখা হয়েছে।
গ্রামীণফোন অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কোম্পানিটির বক্তব্য, তারা আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মানশীল এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মেনে চলবে।
কর্মী-শেয়ারহোল্ডারকে রিটের আবেদনকারী করা নিয়েও প্রশ্ন
নতুন রিটে গ্রামীণফোনের শিল্প সম্পর্ক বিভাগের প্রধানের পাশাপাশি সাধারণ শেয়ারহোল্ডার মোহাম্মদ আউলাদ হোসেনকে প্রথম আবেদনকারী করা হয়েছে। রিটে বলা হয়েছে, তিনি ২০০৯ সাল থেকে গ্রামীণফোনের ১২ হাজার ৬৪৩টি শেয়ারের মালিক। জিপি রয়েছে দ্বিতীয় আবেদনকারী হিসেবে।
সাবেক কর্মীদের প্রশ্ন, একজন কর্মী-শেয়ারহোল্ডার এমন একটি মামলায় কেন যুক্ত হয়েছেন, যার রায়ের ফলে সাবেক কর্মীদের সম্ভাব্য পাওনা কমে যেতে পারে।
গ্রামীণফোনের বক্তব্য, আউলাদ হোসেন রিটে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন এবং তার কর্মী পরিচয়ের সঙ্গে মামলার কোনো সম্পর্ক নেই।
এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
হাইকোর্ট এখনো জিপির নতুন রিটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। আদালত যদি জিপির আবেদন গ্রহণ করে এবং সুদের হিসাবের ক্ষেত্রে কম হার প্রযোজ্য হয়, তাহলে সাবেক কর্মীদের সম্ভাব্য পাওনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে সাবেক কর্মীদের অবস্থান বহাল থাকলে বকেয়া ডব্লিউপিপিএফ অর্থের ওপর উচ্চতর লভ্যাংশভিত্তিক সুদের দাবি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
ফলে দীর্ঘদিনের এই শ্রম বিরোধে এবার মূল অর্থের পাশাপাশি সুদের হারই কয়েক হাজার সাবেক কর্মী ও গ্রামীণফোনের মধ্যকার নতুন আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।






















