দেশে অবৈধভাবে আমদানি করা মোবাইল হ্যান্ডসেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আবারও জাতীয় যন্ত্রপাতি শনাক্তকরণ ও নিবন্ধন ব্যবস্থা (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এই ব্যবস্থা কার্যকরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্লোন আইএমইআইযুক্ত হ্যান্ডসেট শনাক্ত, অবৈধ ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) জালিয়াতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
তবে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। বিটিআরসির হিসাবে, দেশের বাজারে ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটের ৬০ শতাংশের বেশি গ্রে মার্কেটের। সরকার অবশ্য বলছে, অবৈধ আমদানি বন্ধ হলে দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীরা উৎসাহিত হবেন। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে বাজারে ফোনের দাম কমারও সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে যে বাজার গড়ে উঠেছে অতীতের মতো এবারও কি ঘোষণা দিয়েই থেমে যাবে বিটিআরসি, নাকি বাস্তবে কার্যকর হবে এনইআইআর?
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে দেশে এনইআইআর কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যবস্থায় সিমকার্ডের মতো প্রতিটি মোবাইল হ্যান্ডসেটও নিবন্ধনের আওতায় আসবে। হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বরের মাধ্যমে সেটির পরিচয় ও বৈধতা যাচাই করা হবে।
বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এনইআইআর চালু হলে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া হ্যান্ডসেটের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। একই আইএমইআই নম্বর একাধিক ফোনে ব্যবহার করা হলে ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি চুরি হওয়া ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধে ব্যবহৃত হ্যান্ডসেট শনাক্ত করাও সহজ হতে পারে।
সরকারের যুক্তি, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি, ফোন চুরি এবং অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা জরুরি। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে এনইআইআর কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
বিটিআরসির হিসাবে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মোবাইল হ্যান্ডসেট গ্রে মার্কেট থেকে আসে। অর্থাৎ, এসব ফোন বৈধ আমদানি প্রক্রিয়া ও প্রযোজ্য কর-শুল্ক পরিশোধের বাইরে দেশে প্রবেশ করে বলে দাবি করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
তবে গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের মোবাইল ফোন বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি তাদের দখলে। তাদের মতে, বাজারের বড় অংশে আনঅফিশিয়াল ফোন বিক্রি হয় এবং এনইআইআর কার্যকর হলে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এখানে গ্রে মার্কেটের প্রকৃত আকার নিয়ে দুই পক্ষের পরিসংখ্যানে বড় ব্যবধান রয়েছে। বিটিআরসির ৬০ শতাংশের বেশি এবং ব্যবসায়ীদের ৯০ শতাংশের বেশি—দুই দাবির হিসাবের ভিত্তি, সময়কাল ও নমুনা পদ্ধতি প্রকাশ করা হলে বাজারের প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।
হ্যান্ডসেট নিবন্ধন নিয়ে বিটিআরসির উদ্যোগ নতুন নয়। ২০১৬ সালে সিমকার্ড নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর পর তৎকালীন সরকার একাধিকবার মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
বিটিআরসি প্রায় ছয় বছর আগে প্রায় ৩০ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ব্যবস্থা চালুর পর তা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে বিগত সরকারের আমলেও নতুন করে এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বারবার উদ্যোগ নেওয়া এবং পরে তা স্থগিত হয়ে যাওয়ার কারণে বাজারে অবৈধ হ্যান্ডসেটের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই আনঅফিশিয়াল ফোন বিক্রির একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে।
গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের একটি বড় যুক্তি হলো, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ব্যবসা করেছেন। তাদের অনেকেরই ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যেই বড় বড় মার্কেট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আনঅফিশিয়াল ফোন বিক্রি হয়েছে। একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স থাকা মানেই অবৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বিক্রির বৈধতা নয়—এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যবসার অনুমতি, আমদানি নীতি এবং শুল্ক-কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা পৃথক বিষয়। তাই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের প্রশ্নের পাশাপাশি অবৈধ আমদানি ও কর ফাঁকির অভিযোগেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এনইআইআর কার্যকর হলে অবৈধ আমদানি ও ক্লোন আইএমইআইযুক্ত ফোন নিয়ন্ত্রণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অতীতে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবার বিটিআরসির সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।






















