দেশের অন্যতম জনপ্রিয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি তাদের প্রধান কার্যালয়ের জন্য একটি বাণিজ্যিক ভবন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আহমেদ-এর পরিবারের মালিকানাধীন। এই সিদ্ধান্তটি ব্যাংকের স্বার্থের চেয়ে চেয়ারম্যান পরিবারের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, এতে ব্যাংকটি আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
উচ্চমূল্যে ভবন কেনার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রতি ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ৪৭ নম্বর হোল্ডিংয়ের সাড়ে ২১ তলা ভবনটি ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা খরচ করে কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এই ভবনটি গত পাঁচ বছর ধরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ভাড়া নেওয়া ছিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভবনটির মালিকানা রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাহাবুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আছমা আহমেদ-এর নামে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবনটির মোট আয়তন ২ লাখ ৭ হাজার ৩৪০ বর্গফুট, যার ভিত্তিতে প্রতি বর্গফুটের দাম ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার টাকা। অথচ নির্মাণ খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়ও এ ধরনের ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে সর্বোচ্চ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা খরচ হতে পারে। এই উচ্চমূল্যে ভবন কেনার সিদ্ধান্তটি ব্যাংকের স্বার্থের বিরুদ্ধে এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের সুস্পষ্ট উদাহরণ বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের আর্থিক সংকট ও মামলার জের
যদিও সাহাবুদ্দিন আহমেদ এখন সরাসরি কোনো পদে নেই, কিন্তু কার্যত তিনিই ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ছেলে সায়েম আহমেদ সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বর্তমানে মেয়ে সাদিয়া রাইন আহমেদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
সাহাবুদ্দিন আহমেদের অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার একটি বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ব্যাংক এশিয়া কর্তৃক দায়ের করা ১২৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মামলায় আদালত সাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং তার ছেলে সায়েম আহমেদের প্রায় ২০ কোটি শেয়ার হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আদালতের এই আদেশের এক দিন পরই ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পর্ষদ এই বিতর্কিত ভবনটি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়, যা একটি জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান ও আর্থিক বিশ্লেষণ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বাজারমূল্যের চেয়ে এত বেশি দামে ভবন কেনার অনুমোদন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেবে না। তিনি আরও বলেন, “সাহাবুদ্দিন আহমেদ আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন এবং বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংকটি থেকে বের করে নিতে চাইছেন। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর-এর কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হবে এবং কোনো কর্মকর্তা এই অনুমোদনে স্বাক্ষর করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আর্থিক পারফরম্যান্সও নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটির মুনাফা ৪১ শতাংশ কমে ৪৭৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে এবং খেলাপি ঋণের হার ৪.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে, ভাড়া, কর ও বিদ্যুৎ বাবদ ব্যয় বেড়ে ২৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার একটি বড় অংশই চেয়ারম্যানের পরিবারকে ভাড়া বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে, ব্যাংকটির পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক দাবি করে বলেন, নিজস্ব ভবন নির্মাণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হতে ১০ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এই বিবেচনায় কেনা সিদ্ধান্তটি সময় সাশ্রয়ী।
বর্তমানে, এই ভবন কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশের ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রক্রিয়া কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।





















