২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে রফতানি আয়ের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সক্ষম হবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ২০৩০ সালের দিকে বিশ্বে গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছবে বলে ধারণা করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ২০২৬ সালের মধ্যেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে। সুতরাং এ মার্কেটে প্রবেশ করার জন্য বাংলাদেশের সামনেও এক অপার সুযোগ এবং সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নভো থিয়েটারে দু’দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বিইএআর সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে এ কথা বলে তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এ আয়োজন কোনো সাধারণ সম্মেলন নয়, বরং এ সম্মেলনকে আমি আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগরদের মিলনমেলা হিসেবে অভিহিত করতে চাই। প্রবাসী বাংলাদেশী, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন- এমন অনেকেই নিজ উদ্যোগে আজকের এ গুরুত্বপূর্ণ সামিটে অংশ নিয়েছেন। আমি আপনাদেরকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই।
তিনি বলেন, এ সামিটে দেশী-বিদেশী প্রযুক্তি বিশারদদের উপস্থিতি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জন্য অবশ্যই অনুপ্রেরণাদায়ক বলে আমি মনে করি। আমি বিশ্বাস করি, আজকের এ সামিটে যারা উপস্থিত রয়েছেন, আপনারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান, বর্তমান সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেই বাংলাদেশ হবে স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা
বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশের সম্ভাবনার বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মিলেমিশে চতুর্থ এবং পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি রচনা করেছে। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শুধু শিল্পই নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এ সময়ে মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার,
চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডাটা সেন্টার কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি,আধুনিক কল কারখানা কিংবা মহাকাশের স্যাটেলাইট – প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য।
বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাজার বর্তমানে দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, ইলেকট্রিক ভেহিকল, স্মার্ট ডিভাইস, ফাইভ-জি এবং সিক্স-জি যোগাযোগব্যবস্থা, ডাটা সেন্টার এবং অটোমেশন প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে চিপের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সুতরাং নিজেদের মেধা এবং উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের সামনেও সম্মানজনক অবস্থান তৈরির এখনই সময়।
সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের তিন হাজারেরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী বর্তমানে আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতার প্রমান রেখে চলেছেন। ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, গবেষক, ম্যানেজার, উদ্যোক্তা হিসেবে অবদান রাখছেন। প্রবাসে থাকা এসব মেধাবীদের বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে আরো গভীরভাবে যুক্ত করার ব্যাপারেও সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় থেকেই উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, এমবেডেড সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং- এইসব ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর খাতকে সরকার একটি জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে এ খাতের উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের চাহিদা অনুযায়ী সরকার সব সুবিধা নিশ্চিত করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর সব ধরণের শুল্ক প্রত্যাহার করেছে সরকার। সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রফতানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন বাস্তবায়নের জন্য
সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকা স্টার্ট আপ অনুদান বরাদ্দ রেখেছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি স্টার্ট আপ অনুদান বিতরণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, সরকার ইতোমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কর সুবিধা এবং বন্ডেজ সুবিধা প্রদান , এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস আরও কার্যকর করতে সরকার কাজ করছে। বিদ্যমান হাইটেক পার্কগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি
একটি বায়োটেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সামনে নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ আছে। দক্ষতার ঘাটতি, ল্যাবের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি আছে। তবে সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেও কিন্তু আমাদের রয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের সে অদম্য ইচ্ছাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়ার জন্য সাধ্য এবং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে বর্তমান সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে এবং থাকবে ইনশাআল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা আর নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষি, পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং ডিজিটাল সেবায় সফলতা দেখিয়ে চলছে। আমাদর মেধাবী তারুণ্য, দক্ষ এবং উদ্যমী জনশক্তির উদ্ভাবনী শক্তির উপর ভর করে পোশাক শিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক গন্তব্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, প্রবাসী পেশাজীবী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানাই।




















