চিকিৎসা থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, শিক্ষা থেকে শিল্পকলা—মানবসভ্যতার এমন কোনো অঙ্গন নেই যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রবেশ করেনি। সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, বিশ্লেষণ করছে, পূর্বাভাসও দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটছে, তার ঢেউ এসে লেগেছে ফুটবলেও। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে এআই শুধু পার্শ্বচরিত্র নয়, একেবারে মূল মঞ্চেই হাজির। রেফারির সিদ্ধান্ত, দলের কৌশল, খেলোয়াড়ের শরীর, দর্শকের নিরাপত্তা সবকিছুতেই এখন যন্ত্রের চোখ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ৪৮ দলের এ বিশ্বকাপে শুধু খেলোয়াড়, কোচ কিংবা রেফারিই মাঠের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন না; তাদের পাশে থাকবে অদৃশ্য শক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
এ পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ম্যাচ বলটি নিজেই। অ্যাডিডাসের নতুন বিশ্বকাপ বল ‘ট্রাইওন্ডা’র ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে ক্ষুদ্র এক সেন্সর, যা প্রতি সেকেন্ডে শত শত বার বলের গতি, স্পর্শ ও অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য পাঠাবে। একজন খেলোয়াড় কখন বল স্পর্শ করলেন, পাস দেয়ার মুহূর্তে বলের অবস্থান কোথায় ছিল কিংবা বল কোনো শরীরের অংশে লেগেছিল কিনা এসব তথ্য তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ করবে কম্পিউটার। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ফুটবলের বলের নকশা বহুবার বদলেছে। এবার বদলে যাচ্ছে তার ভূমিকাও। এখন সেটি একটি সংযুক্ত ডিজিটাল ডিভাইসে পরিণত হয়েছে। বলটি শুধু খেলার সরঞ্জাম নয়, তথ্যের উৎসও।
এ বল থেকে পাওয়া তথ্য যুক্ত হবে স্টেডিয়ামের চারপাশে স্থাপন করা অসংখ্য উচ্চগতির ক্যামেরার সঙ্গে। এআই প্রত্যেক খেলোয়াড়ের শরীরের বিভিন্ন বিন্দু অনুসরণ করে তাদের ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল অবয়ব তৈরি করবে। এর ফলে অফসাইড নির্ধারণে মানুষের চোখের সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হবে।
প্রতিটি স্টেডিয়ামে ১৬টি অপটিক্যাল ট্র্যাকিং ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যা প্রতিটি ম্যাচে ১৫ কোটির বেশি ট্র্যাকিং ডেটা পয়েন্ট তৈরি করতে পারে। এ ব্যবস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের শরীরের ২৯টি বিন্দু পর্যবেক্ষণ করে ডিজিটাল কঙ্কাল-মডেল তৈরি করে, যা থেকে অফসাইডের সিদ্ধান্ত আসবে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে। আগের সংস্করণে সিদ্ধান্তটি প্রথমে ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) কাছে যেত। এবার স্পষ্ট অফসাইড সরাসরি মাঠের রেফারির কাছে পাঠানো হবে, ফলে সহকারী রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পতাকা তুলতে পারবেন। অর্থাৎ, যে সিদ্ধান্ত নিতে একসময় ৭০ সেকেন্ড লাগত, তা এখন মুহূর্তের ব্যাপার।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তি ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল অ্যাভাটার। ৪৮টি দলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াড মিলিয়ে মোট ১ হাজার ২৪৮ খেলোয়াড়কে ডিজিটালি স্ক্যান করা হবে। মাত্র এক সেকেন্ডের এ স্ক্যান প্রক্রিয়ায় খেলোয়াড়ের শরীরের নিখুঁত মাপ ধারণ করা হয়। এ অ্যাভাটারগুলো শুধু রেফারির সিদ্ধান্তে নয়, সম্প্রচারেও ব্যবহৃত হবে। স্টেডিয়ামের বিশাল পর্দায় ও টেলিভিশনে দর্শকরা দেখতে পাবেন বাস্তবসদৃশ ডিজিটাল খেলোয়াড়দের সাহায্যে অফসাইডের দৃশ্য। ফিফা আশা করছে, এতে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ দর্শকের কাছেও সহজবোধ্য হবে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা শুধু রেফারিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক ফুটবলে তথ্যই শক্তি, আর তথ্য বিশ্লেষণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে এআই। বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দলগুলো প্রতিপক্ষের খেলার ধরন, আক্রমণের প্যাটার্ন, দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য কৌশল বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করবে। কোনো দল কোন পরিস্থিতিতে বেশি গোল খায়, কোন খেলোয়াড় চাপের মধ্যে ভুল করার প্রবণতা রাখে কিংবা কোন ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালালে ফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি—এসব বিশ্লেষণ এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই করা যাচ্ছে।
বিশেষ করে টাইব্রেকারের মতো পরিস্থিতিতে এআইয়ের প্রভাব আরো স্পষ্ট হতে পারে। গোলরক্ষক কোন দিকে ঝাঁপ দেয়ার প্রবণতা রাখেন, কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড় সাধারণত বল কোথায় মারেন কিংবা অতীতের শত শত শট বিশ্লেষণ করে কী ধরনের প্রবণতা পাওয়া যায় এসব তথ্য ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হয়তো কোনো বিশ্বকাপ ফাইনালের জয়সূচক গোলের পেছনেও থাকবে একটি অ্যালগরিদমের পরামর্শ।
খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও এআই নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। তাদের প্রতিটি দৌড়, স্প্রিন্ট, পাস, শট এবং শারীরিক নড়াচড়া এখন তথ্য হিসেবে সংরক্ষিত হচ্ছে। এ তথ্য বিশ্লেষণ করে কোচ ও চিকিৎসক দল বুঝতে পারছেন কার ওপর কতটা চাপ পড়ছে, কে চোটের ঝুঁকিতে আছেন এবং কার বিশ্রাম প্রয়োজন। ফলে খেলোয়াড়রা শুধু মাঠের পারফর্মার নন; তারা একই সঙ্গে চলমান ডেটাসেটও।
মাঠের বাইরেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফিফা একটি ‘ইন্টেলিজেন্স কমান্ড সেন্টার’ গড়ে তুলেছে, যা বিভিন্ন স্টেডিয়াম, সম্প্রচার কেন্দ্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার তথ্য একত্র করবে। স্টেডিয়ামের ডিজিটাল প্রতিরূপ বা ‘ডিজিটাল টুইন’ ব্যবহার করে দর্শকদের চলাচল বিশ্লেষণ করা হবে। কোথায় ভিড় জমছে, কোথায় জট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কিনা এসব বিষয়ে আগাম সতর্কতা পাওয়া যাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী, বিদ্বেষমূলক বা অপমানজনক মন্তব্য শনাক্ত করে তা দ্রুত আড়াল করার জন্য বিশেষ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ২০২০ ইউরোর ফাইনালের পর যে ভয়াবহ অনলাইন বিদ্বেষ দেখা গিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ফিফা এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করছে। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো সিদ্ধান্তকে আরো নিখুঁত করবে, খেলার বিশ্লেষণকে আরো গভীর করবে এবং দর্শকদের অভিজ্ঞতাকে আরো সমৃদ্ধ করবে। তবুও ফুটবল শেষ পর্যন্ত কেবল প্রযুক্তির খেলা নয়। গ্যালারির উন্মাদনা, শেষ মুহূর্তের গোলের পর বুকভরা আনন্দ কিংবা বেদনা এখনো মানুষেরই।





















