বিশ্ববিখ্যাত দক্ষিণ কোরিয়ান প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং (Samsung) মোবাইল হ্যান্ডসেটে ইসরাইলি স্পাইওয়্যার বা ট্র্যাকিং প্রোগ্রাম ‘অ্যাপক্লাউড’ (AppCloud)-এর উপস্থিতির এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ব্যবহারকারীদের অজান্তেই ফোনের অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে ডিফল্টভাবে ইনস্টল থাকা এই প্রোগ্রামটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ এবং বড় ধরনের নিরাপত্তাগত প্রশ্নের ঢেউ উঠেছে।
পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা (MENA) অঞ্চলের বিশেষায়িত ডিজিটাল নিরাপত্তা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম ‘SMEX’ (Social Media Exchange)-এর একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্যটি উন্মোচিত হয়েছে।
লেবাননের বৈরুতে অবস্থিত ‘SMEX’-এর সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যামসাংয়ের কিছু নির্দিষ্ট স্মার্টফোন—বিশেষ করে বিশ্ববাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল বিক্রেত ‘গ্যালাক্সি এ’ (Galaxy A) এবং ‘গ্যালাক্সি এম’ (Galaxy M) সিরিজের হ্যান্ডসেটগুলোতে এই প্রোগ্রামটি আগে থেকেই যুক্ত করা থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার বাজারে সরবরাহ করা ডিভাইসগুলোতে ‘অ্যাপক্লাউড’ নামের এই ইসরাইলি প্রোগ্রামটি ডিফল্ট বা ব্লোটওয়্যার (Bloatware) হিসেবে ইনস্টল করা থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে এই প্রোগ্রামটি ডিভাইস থেকে সম্পূর্ণরূপে অপসারণ বা ডিলিট (Uninstall) করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘ফার্স নিউজ’ (Fars News)-এর একটি ফলো-আপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিতর্কিত প্রোগ্রামটি তৈরি করেছে ইসরাইলি শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি ‘আইরনসোর্স’ (ironSource)।
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রোগ্রামটির ডিভাইসের ওপর ব্যাপক প্রশাসনিক অ্যাক্সেস রয়েছে। কোনো স্পষ্ট গোপনীয়তা নীতি (Privacy Policy) প্রদর্শন না করে এবং ব্যবহারকারীর সরাসরি বা স্পষ্ট সম্মতি (Consent) ছাড়াই এটি ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে। এর মাধ্যমে এটি ব্যবহারকারীদের অত্যন্ত সংবেদনশীল ডেটা, যেমন— সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান (GPS Location), আইপি ঠিকানা (IP Address) এবং ডিভাইসের ডিজিটাল আঙ্গুলের ছাপ বা হার্ডওয়্যার আইডেন্টিটি ট্র্যাকিংয়ের অনুমতি পায়।
মোবাইল ইকোসিস্টেমে ইসরাইলি প্রযুক্তির এই গোপন অনুপ্রবেশের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি এক রাষ্ট্রীয় বক্তৃতায় অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেছিলেন: “বিশ্বের যারা মোবাইল ফোন বহন করে, তারা আসলে নিজেদের সঙ্গে ইসরাইলের একটি অংশ বহন করে।”
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য কেবল কোনো রূপক কথা ছিল না, বরং এটি বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও সফটওয়্যার সাপ্লাই চেইনে ইসরাইলি নজরদারি প্রযুক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক এবং অধিকারকর্মীদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুতর ও জীবনঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই অ্যাপের আর্কিটেকচার পরীক্ষা করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, ‘অ্যাপক্লাউড’ সাধারণ কোনো ক্ষতিকারক অ্যাপ নয়, এটি স্যামসাংয়ের নিজস্ব ওয়ানইউআই (One UI) অপারেটিং সিস্টেমের কোডের সাথে অত্যন্ত গভীরভাবে সংহত (System Integrated)।
সাধারণ সেটিংসের মাধ্যমে এটিকে সর্বোচ্চ ‘আংশিকভাবে নিষ্ক্রিয়’ (Disable) করা সম্ভব, কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস থেকে এটি পুরোপুরি বন্ধ হয় না। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ডিভাইস থেকে এটিকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে হলে ফোনটিকে ‘রুট’ (Root Access) করতে হবে। আর অ্যান্ড্রয়েড ফোন রুট করার সাথে সাথেই স্যামসাংয়ের অফিশিয়াল সিকিউরিটি সিস্টেম ‘নক্স’ (Knox) চিরতরে ভেঙে পড়ে এবং ফোনের প্রাতিষ্ঠানিক ওয়ারেন্টি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়। ফলে গ্রাহকেরা এক অভিনব ফাঁদে পড়েছেন।






















