প্রযুক্তির বাজারে আভিজাত্য আর প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতার অপর নাম ‘আইফোন’ (iPhone)। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে, বিশেষ করে পুরাতন বা ব্যবহৃত (Used/Second-hand) আইফোনের বাজারে এখন চলছে এক অভিনব ও সুসংগঠিত জালিয়াতি। ‘ব্যাটারি বুস্ট’ করে ভুয়া হেলথ দেখানো, পাঁচ বছর আগের মডেলের ভেতরে নকল পার্টস ঢুকিয়ে ‘একদম ফ্রেশ ও আন-ওপেনড’ বলে বিক্রি করার এক ভয়ংকর চিত্র সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী গ্রাহক ও খোদ মোবাইল শোরুমের সাবেক কর্মচারীদের বরাতে জানা গেছে, রাজধানীর শীর্ষ শপিং মলগুলোর পুরোনো আইফোন বাজারের একটি বিশাল অংশই এখন অননুমোদিত ও জালিয়াতি করা পণ্যের দখলে।
আইফোন ব্যবহারকারীদের অন্যতম প্রধান মাথা ব্যথার কারণ এর ‘ব্যাটারি হেলথ’ (Battery Health)। আর এই দুর্বলতাকেই পুঁজি করেছে অসাধু বিক্রেতারা। সাধারণত ২-৩ বছর ব্যবহারের পর আইফোনের ব্যাটারি হেলথ স্বাভাবিক নিয়মেই ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেশের বাজারে ৫-৬ বছর আগের মডেল—যেমন আইফোন ১১ বা আইফোন এক্সএস (iPhone XS)-এর ব্যাটারি হেলথও শোরুমগুলোতে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ প্রদর্শন করতে দেখা যায়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত বিশেষ এক ধরণের চাইনিজ ডিভাইস ও সফটওয়্যারের কারসাজি, যার মাধ্যমে ব্যাটারির ‘সাইকেল কাউন্ট’ শূন্য করে কৃত্রিমভাবে হেলথ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, একেই বলা হচ্ছে ‘ব্যাটারি বুস্ট’ (Battery Boost)।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই জালিয়াতি নিয়ে ভুক্তভোগী ক্রেতারা নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। শোরুমগুলোর প্রতারণার কৌশল নিয়ে গ্রাহকদের কিছু সুনির্দিষ্ট মন্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
রবিউল হাসান রকি ও মাহফুজ আহমেদের দাবি: গ্রাহক রবিউল হাসান রকি স্পষ্ট জানান, “বর্তমানে প্রায় সব পুরাতন ফোনের দোকানেই ১০০% বুস্ট ব্যাটারি দিয়ে ফোন সেল করা হচ্ছে।” অন্যদিকে মাহফুজ আহমেদ এক মারাত্মক তথ্য দিয়ে বলেন, “খোঁজ নিয়ে দেখুন, বাংলাদেশের বাজারের প্রায় ৭০% পুরাতন আইফোনেই কোনো না কোনো ভুয়া বা নকল পার্টস রয়েছে।”
বসুন্ধরা ও যমুনা ফিউচার পার্ক নিয়ে ক্ষোভ: পলাশ বিশ্বাস নামের একজন ক্রেতা বলেন, “যমুনা ফিউচার পার্কে ওল্ড আইফোনের মধ্যে ৯৮% ফোনই আন-অথেনটিকেটেড (Unauthenticated)।” এস এইচ রাহুল নামের আরেকজন ক্রেতার মন্তব্য আরও কড়া— “বসুন্ধরা ও যমুনা, দুই জায়গাতেই বাটপারদের রাজত্ব।” মো. সাইফুল নামের এক ভুক্তভোগী নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “যমুনা থেকে আমি ২-৩ বার মোবাইল ফোন কিনেছি, কোনোটিই ভালো টেকেনি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে একদম নতুন ফোন কিনতে হয়েছে।”
সাবেক কর্মচারীর স্বীকারোক্তি: মাহাফুজ আলম নামের এক ব্যক্তি, যিনি নিজে দীর্ঘদিন মোবাইল শোরুমে কাজ করেছেন, তিনি ভেতরের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে বলেন, “আমি নিজে মোবাইলের দোকানে ছিলাম বলে জানি তারা কীভাবে ব্যবসা করে। বর্তমানে বসুন্ধরা এবং যমুনা থেকে পুরাতন ফোন কেনা সবচেয়ে বড় বোকামি। এরা মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে লট বা ত্রুটিযুক্ত ফোন কিনে এনে বাইরে থেকে চকচকে করে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করে। কিছুদিন ব্যবহার করলেই এগুলোর আসল রূপ ও সমস্যা বের হয়ে আসে।”
তবে এই জালিয়াতির পেছনে শুধু বিক্রেতারা নয়, ক্রেতাদের এক ধরণের অবাস্তব ও হুজুগে মনস্তত্ত্বও দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে। বিক্রেতা ও সচেতন মহলের দাবি, কাস্টমারদের অযৌক্তিক চাহিদার কারণেই বাজারে বুস্ট ফোনের সরবরাহ বাড়ছে।
এমডি হেলাল হোসেন ও আল মাহাদী ইসলামের যুক্তি: হেলাল হোসেন বলেন, “আমরা কাস্টমাররা যেরকম খুঁজি, দোকানদাররা আমাদের সেরকমই দেয়। ৫ বছর আগের মডেলের আইফোন কিনতে গিয়েও যদি কাস্টমার বলে ব্যাটারি ৯৫% লাগবে, তখন দোকানদাররা বাধ্য হয়েই ব্যাটারি বুস্ট করায়।” আল মাহাদী ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, “আইফোন এক্সএস-এ যদি কাস্টমার ৯০% ব্যাটারি খোঁজে, তবে বিক্রেতারা বুস্ট ছাড়া কী করবে?”
জামশেদ আলমের কড়া বিশ্লেষণ: জামশেদ আলম নামের এক নেটিজেন পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলেন, “বাঙালি সস্তায় ফোন কিনতে চায়, আবার ফোনের ওয়াটার সিল (Water Seal) খোঁজে—এরা যেন একেকজন ডুবুরি যে পানির নিচে ফোন ব্যবহার করবে! তার ওপর ফোনে কোনো কিছু চেঞ্জ বা রিপেয়ার করা হইছে এটাও মানবে না। ফোন ফাড়মে যাক, থ্রিইউ টুলস (3uTools) সিস্টেমে অরিজিনাল দেখা লাগবে! বাঙালি যেমন অবাস্তব জিনিস বোঝে, তেমনি বাঁশ খায়। বুস্টের চেয়ে ব্যাটারি চেঞ্জ করে নেওয়া ভালো, কিন্তু সাধারণ কাস্টমার তো তা মানতে চায় না।”
নামী শপিং মলে শোরুম খুলে এভাবে আসল অ্যাপল ব্র্যান্ডের নাম ভাঙিয়ে নকল ডিসপ্লে, আঠা দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া বডি এবং সফটওয়্যার দিয়ে লক ও ব্যাটারি হ্যাক করা ফোন বিক্রি করা ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ (DNCRP) এর আইন অনুযায়ী এক বিরাট দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাজারে কার্যকর এবং নিয়মিত কোনো অভিযান না থাকায় এই চক্র দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।





















