কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যাপক প্রসারে বিশ্বজুড়ে কম্পিউটিং ক্ষমতার বাজারে এখন তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা যখন এনভিডিয়ার তৈরি ডেটা সেন্টার ও চিপে শত শত বিলিয়ন ডলার লগ্নি করছে, তখন ওয়াশিংটনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে চিপ তৈরির মূল প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চীন। ফলে বৈশ্বিক এই এআই রেসে বেইজিংয়ের পিছিয়ে পড়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ নতুন এক চিপ আর্কিটেকচার নিয়ে হাজির হয়েছে চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে (Huawei)।
বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন চিপের আকার ক্ষুদ্র করার জন্য ডাচ কোম্পানি এএসএমএল (ASML)-এর তৈরি উন্নত ‘ইইউভি (EUV) লিথোগ্রাফি’ মেশিনের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল, তখন হুয়াওয়ে এমন এক সেমিকন্ডাক্টর চিপ উন্নয়নের ঘোষণা দিয়েছে যা এই ডাচ মেশিনের ওপর মোটেও নির্ভরশীল নয়।
কয়েক দশক ধরে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ইন্টেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুরের ‘মুরের সূত্র’ (Moore’s Law)-কে স্ট্যান্ডার্ড ধরা হতো। এই নীতি অনুযায়ী, একটি ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা প্রতি দুই বছরে দ্বিগুণ করা হতো, যা চিপের কার্যক্ষমতা বাড়ালেও ট্রানজিস্টরকে চরমভাবে ছোট করার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
তবে হুয়াওয়ের প্রস্তাবিত নতুন ‘টাউ রেশিও ল’ (Tau Ratio Law) এই ঐতিহ্যবাহী মডেল থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছে। ট্রানজিস্টরকে জ্যামিতিকভাবে ছোট করার পরিবর্তে এই সূত্রটি প্রসেসরের ভেতরে ডেটার ভ্রমণপথের দূরত্ব কমিয়ে পারফরম্যান্স উন্নত করার ওপর জোর দেয়।
এই নীতির ওপর ভিত্তি করে হুয়াওয়ে উন্মোচন করেছে ‘লজিকফোল্ডিং আর্কিটেকচার’ (Logicfolding Architecture)। কোম্পানিটির দাবি, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে লিথোগ্রাফি টুলের কোনো ধরনের আপগ্রেড ছাড়াই সিগন্যাল ট্রান্সমিশনের সময় রেজিস্ট্যান্স ও ক্যাপাসিট্যান্স হ্রাস করে ট্রানজিস্টরের ঘনত্ব বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
যদিও তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC)-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘৩ডি স্ট্যাকিং’ বা স্তরীভূত চিপ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তবে হুয়াওয়ের এই নতুন সমাধানটি চিপের মূল কাঠামো থেকেই আরও আমূল ও সাহসী পুনর্গঠনের প্রস্তাব করে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনা কোম্পানিগুলো বর্তমানে এএসএমএল-এর কাছ থেকে উন্নত ইইউভি মেশিন কিনতে পারছে না। তত্ত্বগতভাবে, প্রচলিত বা পুরনো ডিপিভি (DUV) মেশিন ব্যবহার করে ৩ ন্যানোমিটার বা তার কম মাত্রার চিপ উৎপাদন করা অসম্ভব। লজিকফোল্ডিং-এর মাধ্যমে হুয়াওয়ে ঠিক এই ভূ-রাজনৈতিক বাধাটিই এড়াতে চাইছে।
হুয়াওয়ের চিপ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা ‘মিসেস হে’ জোর দিয়ে জানিয়েছেন, কোম্পানির এই নতুন অগ্রযাত্রায় লিথোগ্রাফি প্রযুক্তির ধারাবাহিক উন্নতি করা “আর অপরিহার্য থাকবে না”। সফল হলে, এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনটি বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে উদ্ভাবনী ডিজাইন ও উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে চিপের কর্মক্ষমতা বাড়াতে চীনকে সাহায্য করবে।
কোম্পানিটি ইতিমধ্যে একটি উচ্চাভিলাষী রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যার অধীনে চলতি বছরেই স্মার্টফোনে লজিকফোল্ডিং প্রযুক্তির প্রথম চিপ ব্যবহার করা হবে। এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হিসেবে ২০৩১ সালের মধ্যে ১.৪ ন্যানোমিটার প্রসেসের সমতুল্য ট্রানজিস্টর ঘনত্ব অর্জন করার পরিকল্পনা নিয়েছে হুয়াওয়ে, যা টিএসএমসি বা স্যামসাংয়ের সর্বশেষ প্রজন্মের চিপের কর্মক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে।
বাণিজ্যিক উৎপাদন ও তাপীয় চ্যালেঞ্জ
তবে এই তাত্ত্বিক দাবি এবং তা বৃহৎ পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবধান দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্লেষণে প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে:
ত্রুটির উচ্চ হার: একটি স্তরীভূত বা ফোল্ডেড চিপ কাঠামোতে যত বেশি স্তর যুক্ত করা হয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ার জটিলতা তত বাড়ে। এর ফলে ত্রুটিযুক্ত চিপের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা বাণিজ্যিকভাবে লোকসান তৈরি করতে পারে।
থার্মাল ডিস্ট্রিবিউশন: প্রচলিত ফ্ল্যাট চিপের তুলনায় ঘনভাবে স্তরীভূত চিপগুলো বেশি তাপ ধরে রাখে। এই অতিরিক্ত তাপ দ্রুত নিষ্কাশন করতে না পারলে প্রসেসরের স্থায়িত্ব নষ্ট হয়। ফলে হুয়াওয়ের এই চিপগুলোর জন্য অত্যন্ত উন্নত ও জটিল শীতলীকরণ (Cooling) ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।
হুয়াওয়ের পক্ষ থেকে এমন অভাবনীয় দাবি এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৩ সালে, যখন পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত ছিলেন যে নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন ৭ ন্যানোমিটারের নিচে নামতে পারবে না, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৭ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়ায় তৈরি ‘কিরিন ৯০০০এস’ চিপসহ মেট ৬০ প্রো বাজারে এনেছিল হুয়াওয়ে। ফলে লজিকফোল্ডিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে ১.৪ ন্যানোমিটারের সমতুল্য চিপ উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিচ্ছে না বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার।



















