যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত চিপ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেছেন হুয়াওয়ের রোটেটিং চেয়ারম্যান ও ডেপুটি চেয়ারম্যান শু ঝিজুন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের চাপই চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং গবেষণা-উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) ব্যাপক বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে শু ঝিজুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীন, হুয়াওয়ে এবং দেশটির প্রযুক্তি খাতের ওপর এত চাপ সৃষ্টি না করত, তাহলে চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না।
তার ভাষায়, “আমাদের দেশ, আমাদের কোম্পানি এবং পুরো শিল্পখাতকে বাধ্য না করলে আমরা আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতাম না। চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে সত্যিকার অর্থে বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞ।”
নিষেধাজ্ঞা থেকে আত্মনির্ভরতার পথে
২০১৯ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে হুয়াওয়েসহ বেশ কয়েকটি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর ফলে গুগল সেবা থেকে শুরু করে উন্নত চিপ সরবরাহেও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে হুয়াওয়ে।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) উচ্চক্ষমতার জিপিইউ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এনভিডিয়ার A100, H100 এবং এএমডির MI250 সিরিজের মতো শক্তিশালী এআই চিপ সংগ্রহে কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়।
যদিও পরবর্তীতে এনভিডিয়া ও এএমডি চীনের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্করণ তৈরি করে, তবুও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীনা কোম্পানিগুলোকে দেশীয় বিকল্প খুঁজতে হয়।
দেশীয় চিপ শিল্পে নতুন গতি
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় চিপ নির্মাতাদের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলোর আয় বেড়েছে এবং তারা সেই অর্থ গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করতে পেরেছে।
এর ফল হিসেবে গত কয়েক বছরে হুয়াওয়ে, ক্যামব্রিকন, বিরেন এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন কিছু এআই ও প্রসেসর চিপ তৈরি করেছে, যা পারফরম্যান্সের দিক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।
যদিও এসব চিপ এখনো শক্তি দক্ষতার দিক থেকে এনভিডিয়া বা এএমডির সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, তবুও চীনের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এগুলোকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনভিডিয়ার বাজার শেয়ার কমেছে
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াং দীর্ঘদিন ধরেই চীনের ওপর এআই চিপ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছেন। তার মতে, মার্কিন প্রযুক্তিকে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে বিকল্প প্রযুক্তির বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
তিনি এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, চীনা কোম্পানিগুলোকে মার্কিন চিপ থেকে দূরে সরিয়ে দিলে তারা নিজেদের প্রযুক্তি উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করবে এবং একসময় এনভিডিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় চীনের এআই চিপ বাজারে এনভিডিয়ার অংশীদারিত্ব প্রায় ৯৫ শতাংশ ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ও স্থানীয় বিকল্পের উত্থানের ফলে সেই আধিপত্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এআই প্রতিযোগিতায় নতুন বাস্তবতা
নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের এআই খাতের অগ্রগতি কিছুটা ধীর হলেও তা স্থায়ীভাবে থামানো যায়নি। বরং দেশীয় কোম্পানিগুলো দ্রুত বিকল্প প্রযুক্তি উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে।
ফলে বর্তমানে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব হার্ডওয়্যার ব্যবহার করেই উন্নত এআই মডেল তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ স্বল্পমেয়াদে চীনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশটির সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে। আর সেই কারণেই হুয়াওয়ের চেয়ারম্যান আজ প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ধন্যবাদ’ জানাচ্ছেন।



















