নতুন স্মার্টফোন কিনে বা কাজের প্রয়োজনে আমরা যখনই কোনো অ্যাপ ইনস্টল করতে যাই, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কিছু পপ-আপ উইন্ডো। সেখানে জানতে চাওয়া হয়, ‘অ্যালাউ লোকেশন অ্যাক্সেস?’ কিংবা ‘অ্যালাউ ক্যামেরা অ্যান্ড কন্টাক্টস?’। তাড়াহুড়ো করে বা অ্যাপটি ব্যবহারের তীব্র ইচ্ছায় আমরা অনেকেই ‘অ্যালাউ’ বাটনে ক্লিক করি। আমরা ভাবি, এটি হয়তো অ্যাপ চালুর সামান্য এক আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এই একটি মাত্র ‘ক্লিকের’ মাধ্যমে আমরা অজান্তেই নিজের প্রতি মুহূর্তের নিখুঁত অবস্থান তুলে দিচ্ছি ‘ডেটা ব্রোকার’ নামক একদল অদৃশ্য ব্যবসায়ীর হাতে, যা পরে কোটি কোটি ডলারে বিক্রি হচ্ছে উন্মুক্ত বাজারে।
সম্প্রতি জার্মানির ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক মিডিয়া নেটজপলিটিক, যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটি ও মার্কিন টেক ম্যাগাজিন ‘ওয়্যার্ডের’ পৃথক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অন্ধকার বাজারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
লোকেশন ডেটা কী ও এর উৎস
সহজ ভাষায়, ডিজিটাল মানচিত্রে কোনো ব্যক্তি বা ডিভাইসের (স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ) এই মুহূর্তের ভৌগোলিক ঠিকানাই হলো লোকেশন ডেটা। এই ডেটা মূলত ৪টি উৎস থেকে তৈরি হয়:
জিপিএস (GPS): স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কয়েক মিটারের মধ্যে নিখুঁত অবস্থান ম্যাপে ফুটিয়ে তোলে।
আইপি অ্যাড্রেস: ইন্টারনেট কানেকশনের সুনির্দিষ্ট আইপি দিয়ে ব্যবহারকারী কোন দেশ বা শহরে আছেন তা জানা যায়।
ওয়াইফাই ও ব্লুটুথ: আশেপাশের রাউটার বা ব্লুটুথ ডিভাইসের সিগন্যাল স্ক্যান করে অবস্থান ট্র্যাক করা সম্ভব।
মোবাইল টাওয়ার: সিমটি যে টাওয়ারের নেটওয়ার্কে থাকে, সেখান থেকে দূরত্বের হিসাব কষে অবস্থান বের করা হয়।
যেভাবে চলে ডেটা কেনাবেচার ৪টি ধাপ
যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির সাইবার পলিসি ফেলো জাস্টিন শেরম্যান ও তাঁর গবেষক দলের মতে, ব্যবহারকারীর ফোন থেকে ক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছাতে ডেটা প্রধানত ৪টি ধাপ পার হয়:
১. সংগ্রহ: আবহাওয়া বা গেমের অ্যাপে লোকেশন অ্যালাউ করলে অ্যাপের ভেতরের ‘সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিট’ (SDK) নামক ছোট কোড ব্যাকগ্রাউন্ডে জিপিএস কোঅর্ডিনেট রেকর্ড করতে থাকে।
২. রিয়েল-টাইম বিডিং: কোনো সাইটে ঢোকার পর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে স্ক্রিনে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো হবে তার একটি ডিজিটাল নিলাম চলে। এই নিলামের সময় বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কগুলোর কাছে ব্যবহারকারীর অবস্থান ও ডিভাইসের আইডি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায়।
৩. একত্রীকরণ: এক্স মোড, আউটলজিক, নিয়ার বা কোচাভার মতো ডেটা ব্রোকার কোম্পানিগুলো প্রতিদিন বিলিয়ন বিলিয়ন ডেটা কিনে বিশাল ডেটাবেস তৈরি করে।
৪. বিক্রি: ব্রোকাররা এই ডেটা ফিল্টার করে সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি (যেমন: কারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট হাসপাতালে যায় বা সামরিক ঘাঁটিতে থাকে) বানিয়ে কর্পোরেট বা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিক্রি করে।
কত দামে বিক্রি হয় আপনার তথ্য?
গবেষণায় দেখা গেছে, ডেটা ব্রোকারদের বাজারে তথ্যের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারিত হয়। মানুষের স্বাস্থ্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং লোকেশন হিস্ট্রি রেকর্ড প্রতি মাত্র দশমিক ১২ ডলারেও বিক্রি হয়।
প্রতি মাসে ১০ হাজার সক্রিয় ব্যবহারকারীর জিপিএস ডেটার দাম ১০০ থেকে ৫০০ ডলার।
নির্দিষ্ট এলাকার বার্ষিক ট্রাফিক ডেটার দাম ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার।
সুনির্দিষ্ট বা স্পর্শকাতর এলাকার নিখুঁত লাইভ ট্র্যাকিং ডেটার দাম ২০ লাখ থেকে কয়েক কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক ডেটা ব্রোকারিং এবং লোকেশন ইন্টেলিজেন্স মার্কেটের আকার বর্তমানে ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রতি বছর এটি প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি
এই ডেটা বাণিজ্য এখন আর কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেনের এক চিঠির বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বাণিজ্যিক অ্যাপের সংগ্রহ করা লোকেশন ডেটার সূত্র ধরে ইরান যুদ্ধে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের টার্গেট করা হচ্ছে। শত্রুপক্ষ এই তথ্যের সুযোগ নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও রাস্তার পাশে বোমা হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা প্যাট হ্যারিসন বলেন, ‘ক্রোমের মতো ব্রাউজারগুলো তৈরিই করা হয়েছে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ ও শেয়ার করার জন্য।’ তবে এর প্রতিক্রিয়ায় গুগলের দাবি, ক্রোমে কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
সুরক্ষিত থাকবেন যেভাবে
ডিজিটাল নজরদারির এই ফাঁদ ও তথ্য বাণিজ্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
অ্যাপ পারমিশন নিয়ন্ত্রণ: স্মার্টফোনের সেটিংসে গিয়ে অ্যাপের লোকেশন অ্যাক্সেস সবসময় ‘ব্যবহারের সময়’ (While using the app) বা ‘কখনোই না’ (Never)-তে রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া ফোনের ‘Location’ টগলটি বন্ধ রাখুন।
বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং সীমিত করা: গতিবিধি ট্র্যাক করে বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রোফাইল তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে মোবাইল ওএস সেটিংসে গিয়ে ‘বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং সীমিত করুন’ (Limit Ad Tracking) অপশনটি চালু করুন।
ডেটা মুছে ফেলা: ডেটা ব্রোকারদের ডেটাবেস থেকে আপনার ব্যক্তিগত গতিবিধির ইতিহাস মুছে ফেলতে ‘ডিলিট মি’ বা ‘ইনকগনিটো’ এর মতো নির্ভরযোগ্য ডেটা রিমুভাল টুল ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারেন।




















