ওয়াল স্ট্রিটের দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা ভেঙে ইতিহাস গড়ার পথে স্পেসএক্স। মূল অফার ছাড়ার এক সপ্তাহ আগেই প্রতিটি শেয়ারের দাম ১৩৫ ডলার ঘোষণা করেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স।
এ ঐতিহাসিক আইপিও’র মাধ্যমে রেকর্ড ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে কোম্পানিটি, যা সফল হলে স্পেসএক্সের বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বুধবার নিজেদের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের জন্য শেয়ারের মূল্য ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করেছে স্পেসএক্স। এর মাধ্যমে ওয়াল স্ট্রিটের দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে কোম্পানিটি, যেখানে নিজস্ব উপায়ে রেকর্ড পরিমাণ তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে মাস্কের দৃঢ় সংকল্প আরও একবার ফুটে উঠল।
সাধারণ নিয়মে মূল অফার ছাড়ার এক সপ্তাহ আগেই কোনো বড় কোম্পানির পক্ষ থেকে এভাবে শেয়ারের দাম ঘোষণার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের আইপিও ইতিহাসে বিরল।
স্পেসএক্সের এমন পদক্ষেপ আর্থিক বাজারে মাস্কের সেই জাদুকরী ও দুঃসাহসী ইমেজকেই মনে করিয়ে দিয়েছে, যার ছোঁয়ায় সবই সফল হয়। এ মোটা অংকের তহবিল সংগ্রহের পর স্পেসএক্সের বাজারমূল্য বিস্ময়কর রকমের উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছাবে।
স্পেসএক্সের সংশোধিত আইপিও আবেদনপত্রটি এ সপ্তাহের শুরুর দিকে দেওয়া রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনকেও নিশ্চিত করেছে, যেখানে শেয়ারের দাম ১৩৫ ডলার হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
কোম্পানিটির লক্ষ্য এই আইপিও থেকে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার তোলা। এমনটা সফল হলে স্পেসএক্সের মোট বাজারমূল্য দাঁড়াবে ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কোম্পানিটিকে মুহূর্তের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ১০ মূল্যবান কোম্পানির তালিকায় জায়গা করে দেবে।
বৃহস্পতিবার থেকে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রোডশো শুরু করবে। আর ১১ জুন শেয়ারের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হবে এবং তার পরের দিনই নাসডাকে স্পেসএক্সের আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হয়ে যাবে।
স্পেসএক্সের এ আইপিও’র ক্ষেত্রে প্রচলিত সব নিয়ম বা গাইডবুক নতুন করে লিখেছেন মাস্ক। তিনি যেমন সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারীদের বড় অংশীদারিত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, তেমনই দ্রুত সময়ের মধ্যে কোম্পানিটিকে মূল স্টক ইনডেক্সে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছেন। সেইসঙ্গে কোম্পানির ওপর প্রতিষ্ঠাতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য এর শাসন কাঠামোও তিনি সেভাবেই সাজিয়েছেন।
এ আইপিও’তে অংশ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা একজন বিনিয়োগকারী মন্তব্য করেছেন, “এই আইপিও’র কোনো কিছুই স্বাভাবিক বা প্রচলিত নিয়ম মেনে হচ্ছে না। তবে সত্যি বলতে, এমনটা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে যাচ্ছে। ফলে এমন ব্যতিক্রমী ঘটনায় অবাক হওয়ারও কিছু নেই।”
বিনিয়োগকারীদের ওপর মাস্কের একক প্রভাব
স্পেসএক্সের অতি-উচ্চ বাজারমূল্য নিয়ে বাজারে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও মাস্কের আকাশচুম্বী খ্যাতি ও লাখ লাখ ডলার ফি বা কমিশন আয়ের সুযোগ থাকায় ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় কোম্পানির মধ্যে এ চুক্তির অংশীদার হওয়ার জন্য রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে।
এক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী বলেছেন, নামী বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে এখন এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার প্রতিযোগিতা চলছে। তারা বোঝাতে চাচ্ছে, ‘আমরাই সবার আগে এখানে অর্থ খাটিয়েছি’, যা বিনিয়োগকারীদের ওপর মাস্কের একচ্ছত্র প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণকেই বারবার প্রমাণ করেছে।
শেয়ার বাজারে স্পেসএক্সের সমকক্ষ বা তুলনা করার মতো পাবলিক স্পেস কোম্পানির সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। এছাড়া মহাকাশ বিজ্ঞান, টেলিযোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা খাতের মতো বহুমুখী ক্ষেত্রে কোম্পানিটির বিস্তৃতি থাকায় এর সুনির্দিষ্ট কোনো পাবলিক মার্কেট বেঞ্চমার্ক বা মাপকাঠি নেই।
২০২৫ সালে কোম্পানিটির রাজস্ব ৩৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ডলারে পৌঁছালেও, বছর শেষে তাদের নেট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৯৪ কোটি ডলার।
বিশ্বজুড়ে টেলিযোগাযোগ শিল্পের গবেষণা সংগঠন ‘জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্স’-এর গবেষণা ও পরামর্শ বিভাগের প্রধান টিম হ্যাট বলেছেন, “বাহ্যিক দৃষ্টিতে, রাজস্বের তুলনায় প্রায় ৯০ গুণেরও বেশি বাজারমূল্য যে কোনো মানদণ্ডেই বেশি। তবে আবারও বলতে হয়, স্পেসএক্স কোনো প্রচলিত ধারার কোম্পানি নয় এবং সাধারণ শেয়ার বাজারে এর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার মতো কোনো প্রকৃত উদাহরণও নেই।”
রোডশো ও পরবর্তী প্রস্তুতি
সাধারণত রোডশো’র মাধ্যমেই বিভিন্ন কোম্পানি ও তাদের ব্যাংকাররা বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেন, যাতে শেয়ার বিক্রির একটি সম্ভাব্য দাম নির্ধারণ করা যায়।
এ প্রক্রিয়াটিতে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ব্যাংকারদের সম্পর্ক ও আসন্ন বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়া কতটা গভীর তা-ই প্রকাশ পায়।
রোডশো শুরু হওয়ার আগে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রাথমিক কিছু বৈঠকের পর স্পেসএক্স ইঙ্গিত দিয়েছিল, তারা প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য আশা করছে। তবে কিছু বিনিয়োগকারী এ মূল্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা তার কম রাখার পক্ষে ছিলেন।
গোল্ডম্যান স্যাকসের মাধ্যমে লেনদেন করা একজন বিনিয়োগকারী বলেছেন, তিনি এ আইপিও’র শেয়ার কেনার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাকে জানানো হয়েছে, স্পেসএক্সের আইপিও শেয়ার কার কপালে জুটবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বয়ং গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান নির্বাহী ডেভিড সলোমনের পর্যায়ের ব্যাপার।
ওই বিনিয়োগকারীর ব্যাংকার তাকে পরামর্শ দিয়েছেন, কোম্পানিটি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরেই যেন তিনি শেয়ার কেনেন।
স্পেসএক্সের এ আইপিও’র আরও কিছু দিক বেশ নজর কেড়েছে। ‘মিজুহো’, ‘ডয়চে ব্যাংক’, ‘ইউবিএস’ ও ‘বার্কলেইস’-এর মতো বড় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন নিজ নিজ দেশের ধনী একক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার দিকে মনোযোগ দেয়।
অতীতে যেখানে ব্যাংকাররা ‘ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস’-এর মতো বড় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বা ‘সিটাডেল’-এর মতো শক্তিশালী হেজ ফান্ডের মতামতের ওপর জোর দিতেন, সেখানে এবার সাধারণ বা একক বিনিয়োগকারীদের দিকে এতটা মনোযোগ দেওয়া বেশ ব্যতিক্রমী ঘটনা।
এর আগেই এক প্রতিবেদনে রয়টার্স বলেছিল, কোম্পানিটি এ আইপিও’র প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অংশ সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা ভাবছে। বিষয়টি মাস্কের প্রতি অন্ধ ভক্তদের আবেগকে কাজে লাগানোর এক নজিরবিহীন প্রয়াস, যা একইসঙ্গে কোম্পানির মালিকানাকে আরও বিস্তৃত করবে।
স্পেসএক্সের এই শেয়ার না কেনা কানেকটিকাটের ফেয়ারফিল্ডে অবস্থিত ‘ডেকোটা ওয়েলথ’-এর সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার রবার্ট পাভলিক বলেছেন, “মানুষ কেন এই শেয়ারের মালিক হতে চাইবে? তার একমাত্র কারণ মাস্কের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশেষ মর্যাদা ও আকর্ষণ। তবে আমার কাছে এমনটা মূল ধারার চেয়ে পাশ্ববর্তী চমক বা সাইডশো হিসেবেই বেশি আকর্ষণীয়।”



















