বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের তীব্র সংকট, স্মার্টফোনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং এর বিপরীতে দেশের বাজারে রিফারবিশড বা অবৈধ ক্লোন ফোনের দাপট—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময় পার করছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও মোবাইল খাত। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দেশের মোবাইল বাজারের বর্তমান অবস্থা, কিস্তিতে মোবাইল বিক্রির নতুন ব্যাংকিং উদ্যোগ এবং দেশীয় উৎপাদন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে টেকজুম ডটটিভি এর মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি)-এর সভাপতি এবং এডিসন গ্রুপের (সিম্ফনি মোবাইল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া শাহিদ।
প্রযুক্তিপ্রেমী ও খাত সংশ্লিষ্টদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ টেকজুম পাঠকদের জন্য প্রশ্নোত্তর আকারে হুবহু তুলে ধরা হলো—
টেকজুম: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের যে তীব্র সংকট চলছে, আমাদের দেশের আমদানিনির্ভর মোবাইল খাতে এর কেমন প্রভাব পড়ছে?
জাকারিয়া শাহিদ: মেমোরি বা চিপের দাম বর্তমানে যেভাবে বাড়ছে, তা সত্যি বলতে আমাদের ধারণার বাইরে চলে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। এর চেয়েও বড় সংকট হলো, বাজারে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাজেটের বা ‘লো-এন্ড’ সেগমেন্টের (যেমন ৩/৬৪ জিবি বা ৪/৬৪ জিবি) ফোনের জন্য মেমোরি চিপ পাওয়াই যাচ্ছে না। বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায়নি। আমরা ধারণা করছি, আগামী বছরের জুলাই পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৩০ শতাংশ মেমোরি চিপের ঘাটতি থাকবে।
টেকজুম: বাজারে তো বিভিন্ন দামের ফোন আছে। এই চিপ সংকটের ধাক্কাটা কোন শ্রেণির গ্রাহকদের ওপর সবচেয়ে বেশি লাগছে বলে মনে করেন?
জাকারিয়া শাহিদ: সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাজেটের ফোনগুলোর ওপর। কারণ সাধারণ স্মার্টফোনের পাশাপাশি অন্যান্য আইওটি (IoT) ডিভাইসেও এই কম ক্ষমতার মেমোরি ব্যবহার করা হয়, ফলে সব মিলিয়ে এই সেগমেন্টে চাপ অনেক বেশি। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে ব্র্যান্ডগুলোর উৎপাদনও প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে। এই বৈশ্বিক সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও অন্তত দেড় থেকে দুই বছর সময় লেগে যেতে পারে।
টেকজুম: মোবাইল ফোনের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির বাজারে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ধরে রাখতে আপনারা কী ভাবছেন?
জাকারিয়া শাহিদ: ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে মাননীয় আইসিটি উপদেষ্টার পরামর্শে আমরা একটা বড় উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে একটি বিশেষ ‘প্রোডাক্ট’ ডিজাইন করার নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণ গ্রাহকদের কাছে সরাসরি কিস্তিতে মোবাইল ফোন বিক্রি করতে পারবে। আগে আমাদের দেশে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কিস্তিতে মোবাইল বিক্রির এমন সরাসরি কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
টেকজুম: কিস্তিতে ফোন বিক্রির এই ব্যাংকিং সুবিধা ক্রেতাদের কতটা স্বস্তি দেবে?
জাকারিয়া শাহিদ: দেখুন, বর্তমান বাজারে একবারে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি স্মার্টফোন কেনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকগুলো যখন সহজ কিস্তির সুবিধা দেবে, তখন ক্রেতাকে এককালীন বড় অংকের টাকা (ক্যাপেক্স) দিতে হবে না। যদিও ফাইন্যান্সিং কস্ট বা ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার কারণে ফোনের দাম সামান্য কিছু বাড়তে পারে, কিন্তু এককালীন টাকা দেওয়ার চাপ না থাকায় কাস্টমাররা স্বাচ্ছন্দ্যে ফোন কিনতে পারবেন।
টেকজুম: এবারের জাতীয় বাজেটে মোবাইল খাতের জন্য ইতিবাচক কোনো দিক দেখছেন কি?
জাকারিয়া শাহিদ: হ্যাঁ, এবারের বাজেটে ভ্যাট (VAT) বা মূল্য সংযোজন করের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও ইতিবাচক প্রস্তাব এসেছে। আগে আমাদের এই খাতে ‘ডাবল ভ্যাট’ বা দ্বৈত করের একটা বড় সমস্যা ছিল। নতুন অর্থবিল পাস হলে হাত বদলের সময় শুধুমাত্র যতটুকু ‘ভ্যালু এডিশন’ বা মূল্য সংযোজন হবে, ঠিক ততটুকুর ওপরই ভ্যাট দিতে হবে। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
টেকজুম: দাম বাড়ার কারণে বাজারে কি অবৈধ, কপি বা ক্লোন ফোনের দাপট বাড়ার কোনো আশঙ্কা আছে?
জাকারিয়া শাহিদ: অবশ্যই এই আশঙ্কা প্রবল। বাজার যখন চড়া হয়, তখন রিফারবিশড, কপি বা ক্লোন ফোন এবং চোরাই পথে আসা অবৈধ ফোনের দাপট বাড়ে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এসব অবৈধ ফোনের কারণে ক্রেতারা সম্পূর্ণ প্রতারিত হন, কোনো বিক্রয়োত্তর সেবা (আফটার সেলস সার্ভিস) পান না এবং এগুলো দেশের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। আমরা এমআইওবি-র পক্ষ থেকে সবসময়ই বলে আসছি, এই ক্লোন ও চোরাই পণ্যের বাজার যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে এবং আমদানি শুল্ককে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।
টেকজুম: বৈশ্বিক এই চিপ সংকটে সিম্ফনি বা ওয়ালটনের মতো দেশীয় উৎপাদনকারী কারখানাগুলো কি কোনো বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে?
জাকারিয়া শাহিদ: না, কোনো বাড়তি সুবিধা আমরা পাচ্ছি না, বরং আমাদের লোকসান বা ক্ষতিই বেশি হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক চিপ সরবরাহকারীরা সবসময় বড় কোয়ান্টিটি বা বেশি পরিমাণের অর্ডারগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। বৈশ্বিক বড় ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডারের আকার বিশাল হওয়ায় তারা চিপ পেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর কোয়ান্টিটি ছোট হওয়ায় আমাদের সাপ্লাই চেইনে বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি ঘটছে।
টেকজুম: আগামী দুই বছরে দেশের মোবাইল শিল্পের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন? ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বা স্মার্টফোন ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা কি পূরণ হবে?
জাকারিয়া শাহিদ: দাম বাড়ার কারণে আমাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের (পেনিট্রেশন) গতি অনেকটাই ধীর হয়ে যাবে। যে স্মার্টফোন আগে মানুষ ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় কিনতে পারত, এখন সেটির দাম ডাবল বা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমাদের কারখানার ডেটা অনুযায়ী দেশে বর্তমানে স্মার্টফোন ও ফিচার ফোনের অনুপাত ৪৫:৫৫। সরকারের লক্ষ্য ছিল দেশের স্মার্টফোন ব্যবহার দ্রুত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করা। কিন্তু বর্তমানের এই বৈশ্বিক চিপ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির বাজারে আগামী দুই বছর আমাদের এই অগ্রগতি বেশ ধীরগতির হবে বলেই মনে হচ্ছে।





















