বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির তালিকায় ফের শীর্ষে উঠেছে টেক জায়ান্ট অ্যাপল। কোম্পানিটির বাজারমূল্য গত শুক্রবার লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮৮ ট্রিলিয়ন ডলার। একই সময় চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার বাজারমূল্য নেমে আসে প্রায় ৪ দশমিক ৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। ওই দিন এনভিডিয়ার শেয়ারদর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। খবর রয়টার্স।
গত বছরের এপ্রিলের পর বাজারমূল্যে ফের শীর্ষস্থান ফিরে পেল অ্যাপল। বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন মূল্যায়নের প্রভাবেই এ পরিবর্তন এসেছে।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে এনভিডিয়া বিশ্বের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের মাইলফলক অতিক্রম করে। এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে ওই সময় কোম্পানিটির শেয়ারদর দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে প্রযুক্তি খাতের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক এগিয়ে যায় এনভিডিয়া।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপলের শীর্ষে ওঠা মানেই এনভিডিয়ার আধিপত্য কমে গেছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। কারণ এআই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত গ্রাফিকস প্রসেসর বা জিপিইউ বাজারে এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এনভিডিয়াই।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এ পরিবর্তন মূলত বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এতদিন এআই খাতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে এনভিডিয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। এখন বিনিয়োগকারীরা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য বড় কোম্পানির সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করছেন।
বিআরআই ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান টনি মেডোজ বলেন, ‘একসময় অ্যাপলকে এআই দৌড়ে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হতো। কারণ প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব এআই মডেল তৈরিতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সে ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।’
অ্যাপল গত মাসে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর ডিজিটাল সহকারী সিরির বড় ধরনের সংস্করণ উন্মোচন করে। নতুন সংস্করণে এআই-ভিত্তিক নানা সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওপেনএআই, গুগল, মেটা ও অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করার চেষ্টা করছে কোম্পানিটি।
একসময় এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে—এমন সমালোচনার মুখে থাকা অ্যাপলের জন্য এ অর্জন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টিম কুকের নেতৃত্বের শেষ পর্যায়ে এমন সাফল্য কোম্পানির ভাবমূর্তিকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
টিম কুকের দায়িত্ব আগামী সেপ্টেম্বরে হার্ডওয়্যার বিভাগের নির্বাহী জন টার্নাসের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। ফলে কোম্পানির নেতৃত্ব পরিবর্তনের আগ মুহূর্তে বাজারমূল্যে শীর্ষে ফেরা অ্যাপলের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে অ্যাপলের সামনেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ভোক্তা চাহিদা কিছুটা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি এমনটি হয়, তাহলে কোম্পানির আয় ও বাজারমূল্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অন্যদিকে এনভিডিয়ার জন্যও সামনে সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মনোভাব পরিবর্তন হলে প্রতিষ্ঠানটির আবার বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির অবস্থান ফিরে পেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
সেগাল মার্কো অ্যাডভাইজরসের আলফা রিসার্চ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হল বলেন, ‘অ্যাপল ও এনভিডিয়ার বর্তমান অবস্থানের মধ্যে মৌলিক কোনো বড় পার্থক্য নেই। ভবিষ্যতে এআই খাত যেদিকেই এগোক না কেন, এনভিডিয়া সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই থাকবে।’
চ্যাটজিপিটি ২০২২ সালে উন্মুক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। বর্তমানে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি, অ্যানথ্রোপিকের ক্লড ও মেটার লামাসহ প্রায় সব বড় এআই মডেল এনভিডিয়ার জিপিইউ ও সিইউডিএ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আগামী কয়েক বছরেও এনভিডিয়ার গড়ে তোলা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সমকক্ষ বিকল্প তৈরি করা সহজ হবে না।
তবে অনেকের মতে এআইকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখন শুধু এনভিডিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এর সুফল পাচ্ছে। বিশেষ করে মেমোরি চিপ নির্মাতারা চলতি বছর উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রন।
এআই অবকাঠামোয় উচ্চক্ষমতার মেমোরি চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মে মাসে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই খাতে শুধু প্রসেসর নয়, মেমোরি প্রযুক্তিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সও চলতি মাসে নাসডাকে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়ে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে একটি বড় প্রতিষ্ঠান।
বেঞ্জামিন হলের মতে, বাজারে নতুন কোম্পানির প্রবেশের ফলে এখন বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি শুধু তথাকথিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী দিনে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির অবস্থান নিয়ে অ্যাপল, এনভিডিয়া ও অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।





















