বহুতল ভবনের নিচতলা, বেজমেন্ট বা ঘরের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই রয়েছে। দেওয়াল, ছাদ কিংবা ঘনবসতির কারণে মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কল কেটে যাওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার সমস্যা প্রায়ই দেখা দেয়। ইনডোর নেটওয়ার্কের এই সমস্যার কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করছে ‘ওয়াই-ফাই কলিং’, প্রযুক্তিগত ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ভয়েস ওভার ওয়াই-ফাই’ বা ‘ভোওয়াই-ফাই’ (VoWiFi)।
ওয়াই-ফাই কলিং কীভাবে কাজ করে?
সাধারণ ফোন কল যেখানে মোবাইল টাওয়ারের মাধ্যমে অপারেটরের মূল নেটওয়ার্কে পৌঁছায়, সেখানে ওয়াই-ফাই কলিং প্রযুক্তিতে কলটি টাওয়ারের বদলে বাসা, অফিস কিংবা যেকোনো ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে সরাসরি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে স্থানান্তরিত হয়।
প্রযুক্তিগতভাবে এটি ‘ভোএলটিই’ (VoLTE)-এর মতোই একই কাঠামো—‘আইএমএস’ (IP Multimedia Subsystem) ব্যবহার করে কথাকে ডাটা প্যাকেটে রূপান্তর করে। ডায়াল করার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর জন্য বাড়তি কোনো অ্যাপের প্রয়োজন হয় না এবং স্বাভাবিক কলিং ইন্টারফেস দিয়েই ডায়াল করা যায়। এমনকি কথা বলার সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ওয়াই-ফাইয়ের মধ্যে ফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুইচ করতে পারে।
বিটিআরসি’র নীতিমালা ও শর্তাবলী
বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) শর্তসাপেক্ষে দেশে এই সেবার অনুমোদন দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী:
নিরাপত্তা ও ট্র্যাকিংয়ের স্বার্থে প্রতিটি কলের রেকর্ড ডিভাইসের ভৌগোলিক অবস্থান, আইপি (IP) ও ম্যাক (MAC) অ্যাড্রেসসহ বিটিআরসির কাছে জমা রাখতে হয়।
ভিপিএন (VPN) ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ‘হোয়াইটলিস্ট’ বা অনুমতি তালিকার কঠোর নিয়ম মানতে হয়।
আন্তর্জাতিক রোমিং এবং এয়ারপ্লেন মোড (Airplane Mode) চালু থাকা অবস্থায় এই সেবা ব্যবহার করা যায় না।
বাংলাদেশে যেসব অপারেটরে মিলছে এই সেবা
দেশে প্রথম এই প্রযুক্তি চালু করে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় পরীক্ষামূলক (পাইলট) রান শেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তারা দেশজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে ভোওয়াই-ফাই চালু করে।
অন্যদিকে, গ্রামীণফোন ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি তাদের ভোএলটিই সংযোগধারী গ্রাহকদের জন্য এই ফিচার নিয়ে আসে। দুই ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে; অর্থাৎ নিয়মিত প্যাকেজের কলরেটেই ওয়াই-ফাই দিয়ে কথা বলা যায়।
তবে সেবাটি পেতে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের অনুমোদিত আইএসপি (ISP) সংযোগ থাকা আবশ্যক:
বাংলালিংক: লিংক৩, আইসিসি, কার্নিভাল, পেসনেট, ক্লাউডওয়ান (টেকনোকোর), অগ্নি ও মেট্রোনেটসহ দেড় শতাধিক আইএসপি।
গ্রামীণফোন: ব্র্যাকনেট, কার্নিভাল ইন্টারনেট, চিটাগং অনলাইন লিমিটেড ও মাইম-ইন্টারনেট।
(উল্লেখ্য: রবি ও সরকারি অপারেটর টেলিটক এখনো পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে ওয়াই-ফাই কলিং সেবা চালু করার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।)
মোবাইলে যেভাবে চালু করবেন ওয়াই-ফাই কলিং
এই সেবাটি পেতে ফোনে ‘VoLTE’ এবং হ্যান্ডসেট ম্যানুফ্যাকচারার কর্তৃক ‘VoWiFi’ ফিচার চালু থাকা আবশ্যক।
অ্যান্ড্রয়েড (Android) ফোনে চালু করার উপায়:
১. ফোনের Settings-এ যান।
২. Network & Internet বা Connections অপশনে প্রবেশ করুন।
৩. Mobile Network সিলেক্ট করে Wi-Fi Calling অপশনে যান।
৪. সুইচ অন করে সেবাটি সক্রিয় করুন। (ব্র্যান্ডভেদে অপশনটি Call Settings বা SIM Card & Mobile Network-এর ভেতরেও থাকতে পারে)।
আইফোনে (iOS) চালু করার উপায়:
১. আইফোনের Settings অ্যাপে যান।
২. নিচের দিকে গিয়ে Phone অপশনে ট্যাপ করুন।
৩. Wi-Fi Calling সিলেক্ট করুন।
৪. Wi-Fi Calling on This iPhone সুইচটি অন (সবুজ) করুন।
৫. Enable-এ ট্যাপ করুন এবং জরুরি সেবার জন্য আপনার বর্তমান অবস্থান বা ঠিকানা দিন।





















