আগামী দিনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে? শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করলেই কি হবে, নাকি সেই ব্যবস্থা নিজেই সমস্যার পূর্বাভাস দিতে পারবে, তথ্য বিশ্লেষণ করবে এবং আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?
এই ভবিষ্যৎ নিয়েই গবেষণা করছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে কর্মরত এই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের গবেষণার মূল বিষয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে সহজ করবে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াবে এবং বিভিন্ন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত
বর্তমান যুগে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই কোনো পরিবর্তন আসে না। সেই তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বের করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই বড় বিষয়।
আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহর গবেষণা এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে চায়।
একটি বুদ্ধিমান ব্যবস্থা অতীত ও বর্তমান তথ্য বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে সামনে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। এর মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন অথবা কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সম্ভাব্য সমস্যা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
তার গবেষণা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস, স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং তথ্যের মাধ্যমে কার্বন কমানোর পদ্ধতিকে একটি বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সৌর ও বায়ু শক্তিকে আরও কার্যকর করা
বিশ্বজুড়ে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তবে এই দুই উৎসের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।
একই সময় একটি শহর, কারখানা বা শিল্পাঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদাও সবসময় এক থাকে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব পরিবর্তন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ কোথায়, কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করলে বেশি কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সহায়তা করতে পারে।
আব্দুল্লাহর বৃহত্তর গবেষণার উদ্দেশ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং দক্ষতাও বজায় রাখা।

শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে গবেষণার সংযোগ
গবেষণার পাশাপাশি আব্দুল্লাহ বর্তমানে Forgent Power Solutions-এর VanTran ট্রান্সফরমার ব্যবসায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে Sales Engineer হিসেবে কাজ করছেন।
মাঝারি ভোল্টেজের ট্রান্সফরমার এবং শিল্পক্ষেত্রের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করার কারণে বাস্তব জীবনের অনেক চ্যালেঞ্জ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
তার সাম্প্রতিক গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ট্রান্সফরমারের সম্ভাব্য সমস্যা আগে থেকে শনাক্ত করার বিষয়টিও রয়েছে।
তবে তার মূল লক্ষ্য কোনো একটি যন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য জ্বালানি-নির্ভর খাতে একই ধরনের বুদ্ধিমান প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তিনি কাজ করছেন।
ভবনও হতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদক
আব্দুল্লাহর গবেষণার আরেকটি ক্ষেত্র হলো ভবনের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি যুক্ত করা।
এ ধারণায় একটি ভবন শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে না, বরং ভবনের ছাদ বা বাইরের অংশ ব্যবহার করে নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
তার গবেষণায় ভবনের সঙ্গে সৌর প্রযুক্তি যুক্ত করা, স্মার্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আগাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্বন কমানোর মতো বিভিন্ন বিষয় রয়েছে।
সবগুলো কাজের মধ্যে একটি সাধারণ লক্ষ্য রয়েছে: প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তিকে আরও বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করা।
একটি বৈশ্বিক সমস্যা, একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য
বিশ্বের প্রতিটি দেশ একই ধরনের বিদ্যুৎ সমস্যার মুখোমুখি নয়। তবে প্রায় সব দেশেরই কয়েকটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে: নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, বাড়তে থাকা চাহিদা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানো।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শিল্পায়ন ও নগরায়নের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।
ভবিষ্যতে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিদ্যুতের অপচয় কমানো, সমস্যা আগে শনাক্ত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এ ধরনের প্রযুক্তি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ বলেন,
“আমি এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চাই, যা শুধু বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করবে না, বরং শক্তির অপচয় কমাবে, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াবে এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে। আমার লক্ষ্য হলো এই গবেষণার সুফল যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছানো।”
ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা
আব্দুল্লাহর মতে, আগামী দিনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু তার, ট্রান্সফরমার বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে সেন্সর, তথ্য, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
ফলে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কোনো সমস্যা হওয়ার পর শুধু প্রতিক্রিয়া জানাবে না, বরং আগেই সমস্যা বুঝতে পারবে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি থেকে শিখবে এবং আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
এই লক্ষ্যেই আব্দুল্লাহ আল ফাত্তাহ এমন একটি ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক প্রকৌশল একসঙ্গে কাজ করে আরও নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।



















