মালিকানা, আইনি অনুমোদন ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে শুরু থেকেই নানামুখী বিতর্কে থাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ‘নগদ’ নতুনভাবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় থাকা এই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। নগদ-এর সিংহভাগ অংশীদারিত্ব কিনে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রমতে, এই হাতবদল ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার মোট লেনদেনের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদের নামে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত দায় (Liability) পরিশোধ করবে আবুল খায়ের গ্রুপ। দায় শোধের পর সরকারের কোষাগারে জমা হবে অবশিষ্ট প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সিআইডির করা বর্তমান মামলাগুলোর আইনি নিষ্পত্তি প্রয়োজন হবে। এর আগে সৌদি আরবভিত্তিক একটি বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী প্রায় ১,১০০ কোটি টাকায় নগদ অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিলেও সরকারের নীতিনির্ধারকরা তাতে সায় দেননি।
মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
নগদের এই হাতবদল ও আর্থিক সংকট সমাধানের লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বৈঠকে নগদের বর্তমান দায়দেনা এবং চলমান মামলাগুলোর আইনি জটিলতা নিরসনের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই অধিগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল খায়ের গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, কোটি কোটি গ্রাহকের এই বিশাল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মূলধন, উন্নত প্রযুক্তিগত অবয়ব এবং শক্তিশালী করপোরেট ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। সেই বিবেচনা থেকেই ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করা এবং বর্তমানে ইস্পাত, সিমেন্ট, ভোগ্যপণ্য ও তামাক খাতের অন্যতম শীর্ষ জায়ান্ট আবুল খায়ের গ্রুপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
৬০০ কোটি টাকার ‘ফেইক ই-মানি’ কেলেঙ্কারি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে নগদে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কোনো প্রকৃত অর্থ (Real Money) ব্যাংকিং চ্যানেলে রিজার্ভ বা সংরক্ষণ না করেই ৬০০ কোটি টাকার ‘ফেইক’ বা অবৈধ ই-মানি তৈরি করে বাজারে ছাড়ে প্রতিষ্ঠানটি।
আর্থিক খাতের নিয়ম অনুযায়ী, দেশের ই-মানি বা ডিজিটাল অর্থের লেনদেন ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট ১৬টি তফসিলি ব্যাংকের (যেমন: সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, পূবালী, ডাচ-বাংলা, ব্র্যাক, ইসলামী ব্যাংক ইত্যাদি) মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক সেটেলমেন্ট পরিচালনা করে। যেকোনো এমএফএস বা ডিজিটাল ওয়ালেটের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ ক্যাশ ব্যাকআপ রাখা বাধ্যতামূলক হলেও নগদ তা না করেই ডিজিটাল অর্থ তৈরি করে লোপাট করেছে, যা এখন প্রতিষ্ঠানটির মূল আর্থিক ঘাটতি বা দায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
গ্রাহকভিত্তি ও ভবিষ্যৎ আস্থা
আর্থিক ও আইনি ক্ষেত্রে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেও দেশজুড়ে নগদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকভিত্তি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি এবং দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। এমএফএস বাজারে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বিকাশ’-এর পরেই নগদের অবস্থান।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ দায় থাকলেও এই বিশাল রেডি-মার্কেট যেকোনো বড় দেশীয় বা বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য বড় বাণিজ্যিক সুযোগ। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আশা, আবুল খায়ের গ্রুপের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ ডিজিটাল আর্থিক খাতে ‘নগদ’-এর ওপর সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।





















