এক সপ্তাহের টানা ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা এবং ভয়াবহ পাহাড়ধসে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলার (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বিদ্যুৎ সরবরাহ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। দুর্যোগের কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা টানা কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎহীন থাকায় অচল হয়ে পড়েছে শত শত মোবাইল বিটিএস (টাওয়ার)। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ পুরোপুরি নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গতকালের পর থেকে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক না হওয়ায় এখনো সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না।
পাহাড়ধস ও বন্যায় বিপর্যস্ত পার্বত্য তিন জেলা
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল, রাঙ্গামাটির অধীন তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়, সেখানে গত ৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা দুর্যোগে অর্ধেকেরও বেশি এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পার্বত্য অঞ্চলের বহু স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে, বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর বড় বড় গাছ উপড়ে পড়েছে এবং অনেক সঞ্চালন লাইন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও আবার বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর সরাসরি পাহাড় ধসে পড়েছে। বান্দরবানের রুমা ও থানচির মতো দুর্গম উপজেলাগুলোতে পাহাড়ি সড়ক ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। ফলে রুমা উপজেলায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ পুরোপুরি সচল করা সম্ভব হয়নি। থানচিতে একটানা ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ ছিল না।
চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদে ৯ লাখ গ্রাহকের ভোগান্তি
পার্বত্য এলাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১ ও ২-এর অধীনে থাকা উপজেলাগুলোর অবস্থা আরও নাজুক।
পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১: এর অধীনে থাকা ৮টি উপজেলার প্রায় ৭ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ৭ জুলাই থেকে বন্যার অবনতি ঘটলে ২ লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সরকারি হিসাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় এখনো প্রায় ১৫ হাজার গ্রাহক অন্ধকারে রয়েছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, বোয়ালখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের নিম্নাঞ্চলে এখনো বন্যার পানি থৈ থৈ করায় পোল (খুঁটি) ভেঙে এবং মিটার ডুবে থাকায় বাস্তবে বিদ্যুৎহীন মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২: এই সার্কেলের অধীনে থাকা ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় বন্যার কারণে হাজার হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এবং জেনারেটরের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের মোবাইল টাওয়ারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। নেটওয়ার্ক না থাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসে আক্রান্ত মানুষজন উদ্ধারকারী দল বা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছেন না। এর ফলে গ্রামীণ হাট-বাজারগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, “বান্দরবানের পাহাড় ও সাঙ্গু নদীর পানি উজান থেকে তীব্র বেগে ধেয়ে আসায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের কর্মীরা সীমিত জনবল নিয়ে রাত-দিন কাজ করছেন। তবে যেসব এলাকায় এখনও বন্যার পানি জমে আছে, সেখানে নিরাপত্তা স্বার্থে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পানি নেমে গেলেই দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।”
এদিকে পিডিবি রাঙ্গামাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার মোহন্ত জানান, “দুর্যোগের মধ্যে পার্বত্য এলাকায় সঞ্চালন লাইন সচল রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। রোববার থেকে ৯০ শতাংশের বেশি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে কিছু দুর্গম এলাকায় বিচ্ছিন্ন গ্রাহক পর্যায়ে এখনো কাজ চলছে।”
পিডিবির বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমীর হোসেন বলেন, “বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভাঙার হার এবার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। দুর্গম পথ ও নৌপথ ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে কর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যেতে হয়েছে, যার কারণে সময় বেশি লেগেছে। বৃষ্টি কমে আসায় আমরা পুরোদমে কাজ করছি এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শেষ হবে।”



















