আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ আলম সারওয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক চিঠি দিয়েছিল। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু দুদকের ওই চিঠি কিংবা নির্দেশনার কোনোটাকেই গুরুত্ব দেননি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন। দুদকের অনুসন্ধান উইং ও আইএফআইসি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া ও বেনামি কোম্পানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর সব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে দুদক থেকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী অংশের গভীর ব্যক্তিগত সখ্য, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক স্বার্থের সমঝোতার কারণে সেসব নির্দেশনা বছরের পর বছর ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন।
দুদকের অনুসন্ধান উইং ও আইএফআইসি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট সূত্র বলছে, আইএফআইসি ব্যাংকের শীর্ষ পদে থাকাকালীন শাহ আলম সারওয়ারের বিরুদ্ধে ঋণের নামে ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ লুটপাট ও পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পায় দুদক। অনুসন্ধান শেষে দুদকের পক্ষ থেকে আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে প্রধানত দুটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল। এতে বলা হয়েছে, সাবেক এমডি সারওয়ারের আমলে যে-সব বিতর্কিত, ভুয়া ও পর্যাপ্ত জামানতবিহীন ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে ব্যাংকের নিজস্ব অডিট টিমের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি বলা হয়েছিল, প্রাথমিক অনুসন্ধানে যাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ ছাড়ের প্রমাণ মিলেছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া।
সূত্রগুলো বলছে, দুদকের এই কঠোর চিঠির পরও সাবেক এমডি শাহ আলম সারওয়ারের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ। উল্টো তাকে এক অভিনব উপায়ে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। সূত্র বলছে, এমডি হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা বিতর্কের মুখে পড়ার পরও সারওয়ারকে ব্যাংক থেকে বিদায় না দিয়ে, তৎকালীন প্রভাবশালী চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন তাকে ব্যাংকের ‘কৌশলগত উপদেষ্টা’ বা সমমানের একটি বিশেষ প্রভাবশালী পদে বসান।
ব্যাংকসূত্র বলছে, দুদকের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সারোয়ারকে এই পদে পুনর্বাসনের মূল কারণ ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব ও ব্যবসায়িক সমঝোতা। এই সুরক্ষা বলয়ের কারণে তিনি আড়ালে থেকে ব্যাংকের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পান, যা ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, তৎকালীন প্রভাবশালী পরিচালক ও শীর্ষ নেতৃত্বের নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নামে এবং নামে-বেনামে খোলা অসংখ্য ভুয়া কোম্পানির আড়ালে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ দেওয়া হয়। যার সিংহভাগই বর্তমানে খেলাপি ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি, ‘শ্রীপুর টাউনশিপ’ সহ বেক্সিমকোর বিভিন্ন বিতর্কিত আবাসন প্রকল্পের নামে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার কোটি টাকার তহবিল ছাড় করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি। দুদকের চিঠিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অনুমোদন ও ছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছিল এবং এগুলোকে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় জালিয়াতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ইতোমধ্যে আইএফআইসি ব্যাংকের পুরনো ও বিতর্কিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ও স্বাধীন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। বর্তমান অন্তবর্তীকালীন পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে শাহ আলম সারওয়ারের আমলে দেওয়া সব ধরনের বিতর্কিত ও সন্দেহজনক ঋণের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফরেনসিক অডিট’ শুরু করেছে।
সংলিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অডিটের প্রতিবেদন হাতে এলেই সাবেক এমডি এবং তাকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া তৎকালীন চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতি আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে আইএফআইসি ব্যাংক (পিএলসি) চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া খুদে বার্তা পাঠালে তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মূখপাত্র আরিফ হোসেন খান এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া খুদে বার্তা পাঠালে তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।





















