দেশে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ডিজিটাল প্রতারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন বিস্তৃত হয়েছে এই বিপজ্জনক অপরাধের জাল।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সদ্য প্রকাশিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বিএফআইইউ-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০২০ থেকে ২০২৪ সাল) ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে ৬ হাজার ২২২টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকারও বেশি জমা এবং প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এই সময়ে সংস্থাটি প্রায় দুই হাজার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (STR/SAR) পেয়েছে।
৫ বছরে অপরাধ বেড়েছে ২১ গুণ
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে এ ধরনের সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ৫০টি। কিন্তু মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে, ২০২৪ সালে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৪৬টিতে। পাঁচ বছরে এই অপরাধের হার প্রায় ২১ গুণ বৃদ্ধি পাওয়াকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের কার্যক্রম বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে বিএফআইইউ।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনলাইন গেমিং ও জুয়ার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ শুধু দেশের ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্টেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে এই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন বাইনান্স), হুন্ডি এবং অন্যান্য অবৈধ চ্যানেল ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউএনওডিসি ও টিআইবি-এর পর্যবেক্ষণ
প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (UNODC) একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়েছে—পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রগুলো অর্থ পাচারের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে অনলাইন জুয়া এবং ভার্চুয়াল সম্পদভিত্তিক (Virtual Assets) প্ল্যাটফর্মগুলোকে বেছে নিচ্ছে।
একইভাবে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (TIB) এক গবেষণার সূত্র দিয়ে বলা হয়, দেশের এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে অপব্যবহার করে জুয়ার টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। অনেক গ্রাহক সর্বস্বান্ত হলেও আইনি জটিলতার ভয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন না, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য অপরাধী সনাক্তকরণ আরও কঠিন করে তুলছে।
আইনি অবস্থান: জুয়া ও ক্রিপ্টো দুটোই অবৈধবিএফআইইউ স্পষ্ট করেছে যে: সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের অনলাইন জুয়া ও বেটিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা প্রজ্ঞাপন (এফই সার্কুলার-২৪, ২০২২) অনুযায়ী, ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি বাংলাদেশে কোনো বৈধ মুদ্রা নয়। ফলে এর মাধ্যমে যেকোনো লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ।
লেনদেনে শীর্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রাম: ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেও
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অবৈধ নেটওয়ার্ক এখন আর শুধু মেট্রোপলিটন কেন্দ্রিক নয়। তবে লেনদেনের অঙ্কে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা জেলা (১,৬২৮ কোটি টাকা জমা)। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম (২৯১ কোটি টাকা জমা)। এছাড়া সাতক্ষীরা, নওগাঁ, রাজশাহী, বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, ফেনী ও ফরিদপুরেও বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও নওগাঁয় জমাকৃত অর্থের প্রায় পুরোটাই দ্রুত উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে সেখানে অর্থ পাচারের ‘প্লেসমেন্ট’ ও ‘লেয়ারিং’ ধাপ খুব দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে।
অপরাধে জড়াচ্ছেন চাকরিজীবী ও গৃহিণীরা
আশ্চর্যজনকভাবে, এই অবৈধ কার্যক্রমে দেশের প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা মিলছে।
চাকরিজীবী: সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন চাকরিজীবীরা। তাদের অ্যাকাউন্টে ৬৪২ কোটি টাকার বেশি জমা ও উত্তোলনের তথ্য মিলেছে।
অন্যান্য পেশা: গৃহিণী, কৃষক, জেলে ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত লেনদেনের পরিমাণ ৭৯০ কোটি টাকারও বেশি।
এছাড়া দিনমজুর, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও টিউশনি নির্ভর মানুষের অ্যাকাউন্টেও কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সাধারণ মানুষগুলো হয় বড় কোনো প্রতারণার শিকার হয়েছেন, অথবা চক্রগুলো তাদের অজান্তেই তাদের অ্যাকাউন্ট ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করেছে।
=ঘটনা ১ (ছদ্মবেশী শপ): কাগজে-কলমে ‘এম শপ’ নামের একটি ছোট খুচরা দোকানের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল অনলাইন জুয়ার অর্থ সংগ্রহের আড়াল। মাত্র এক বছরে এই অ্যাকাউন্টে ৫৩ কোটি টাকা জমা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, চক্রটি ৬০২টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে Babu88 এবং 1xBet-এর মতো ৮৯টি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যাংকের ২৫টি অ্যাকাউন্টে পাচার করছিল।
ঘটনা ২ (ই-কেওয়াইসি ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট): একজন ব্যাংক কর্মকর্তা নিজে প্রতারণার শিকার হয়ে ৫২ লাখ টাকা জমা দেওয়ার পর তদন্তে নামে বিএফআইইউ। দেখা যায়, টাকা জমা হওয়ামাত্রই তা আরটিজিএস (RTGS) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২৫টি ভুয়া অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই চক্রের মূল হোতার অ্যাকাউন্টে দুই বছরে ১৪৩ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়, যা ই-কেওয়াইসি (e-KYC) ব্যবহার করে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা হয়েছিল। এই টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি, লাগেজ পার্টি, সোনা চোরাচালান ও হুন্ডির কাজে ব্যবহৃত হতো।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডিআইজি আলি আকবর খান বলেন, “অপরাধীরা ভার্চুয়ালি বিভিন্ন অবস্থান থেকে অপরাধ সংঘটিত করায় তাদের চিহ্নিত করা কঠিন। তারা টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে পাচার করে দিচ্ছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সিআইডি ইতিমধ্যে ৪টি বড় অভিযানে ২১ জন শীর্ষ অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। এই চক্রের বাকিদেরও দ্রুত আইনের আওতাভুক্ত করা হবে।”
ওয়ান ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহিত রহমান বলেন, “আমাদের পেমেন্ট ব্যবস্থা আধুনিক হওয়ার কারণে অতি সহজে ও দ্রুত লেনদেন করা যাচ্ছে, যা অপরাধীরা অপব্যবহার করছে। একজন গ্রাহক আয়ের সাথে অসংগতিপূর্ণ লেনদেন করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক বা চিহ্নিত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং টুলসগুলোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করা প্রয়োজন।”
বিএফআইইউ-এর মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই ডিজিটাল অপরাধ দমন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।



















