একসময় স্মার্টফোন বলতেই অনেকের কাছে ব্ল্যাকবেরির নামটাই ছিল পরিচিত। ব্যবসায়ী, করপোরেট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হাতে নিয়মিত দেখা যেত এই ফোন। দ্রুত ই-মেইল আদান-প্রদান, নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থার কারণে করপোরেট দুনিয়াতেও এর ব্যাপক চাহিদা ছিল।
একপর্যায়ে বিশ্বজুড়ে ব্ল্যাকবেরির গ্রাহকসংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় অল্প সময়ের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যায়। টাচস্ক্রিন স্মার্টফোনের উত্থান, অ্যাপল আইফোনের জনপ্রিয়তা এবং পরে অ্যান্ড্রয়েডের দ্রুত বিস্তারের কাছে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে ব্ল্যাকবেরি।
ব্ল্যাকবেরির যাত্রা অবশ্য শুরু হয়েছিল ভিন্ন নামে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘রিসার্চ ইন মোশন’ (RIM)। ব্যবসায়িক যোগাযোগকে কেন্দ্র করে ১৯৯৮ সালে বাজারে আনা হয় ‘ইন্টারঅ্যাক্টিভ পেজার ৯৫০’। ছোট পর্দা ও বোতামযুক্ত কিবোর্ড ছিল এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
এরপর ১৯৯৯ সালে আসে ‘৮৫০ পেজার’। এতে মাইক্রোসফট এক্সচেঞ্জ সার্ভারের মাধ্যমে ‘পুশ ই-মেইল’ সুবিধা যুক্ত করা হয়। ২০০০ সালে আরআইএম বাজারে আনে ‘ব্ল্যাকবেরি ৯৫৭’। এরপর ব্যবসায়িক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিভাইসটির ব্যবহার বাড়তে থাকায় কোম্পানিটির আয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
সোনালি সময়
২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সময়কে ব্ল্যাকবেরির সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নতুন নতুন ডিভাইস নিয়ে আসে। শুরুতে করপোরেট গ্রাহকদের লক্ষ্য করে ফোন তৈরি করলেও পরে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছেও জনপ্রিয়তা বাড়াতে থাকে।
ব্ল্যাকবেরি পার্ল, কার্ভ ও বোল্ড সিরিজের ফোনগুলো ব্যাপক সাড়া পায়। একপর্যায়ে ব্র্যান্ডটি শুধু একটি ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক ব্যবহারকারীর কাছে ব্ল্যাকবেরি হয়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত পরিচয়ের প্রতীক।
কিন্তু ২০০৭ সালে অ্যাপল আইফোন বাজারে আনার পর স্মার্টফোনের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। টাচস্ক্রিন, অ্যাপভিত্তিক ব্যবহার এবং নতুন ধরনের মোবাইল অভিজ্ঞতা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শুরুতে আইফোনকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি ব্ল্যাকবেরি। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা ছিল, অ্যাপলের নতুন ডিভাইসটি মূলত তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে তৈরি। পরে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ব্যবসায়ী ও করপোরেট ব্যবহারকারীদের মধ্যেও আইফোনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। একই সময়ে অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক বিভিন্ন স্মার্টফোনও বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
টাচস্ক্রিনে দেরিতে প্রবেশ
প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে ২০০৮ সালে প্রথম টাচস্ক্রিন ফোন ‘স্টোর্ম’ বাজারে আনে ব্ল্যাকবেরি। শুরুতে বিক্রি ভালো হলেও পরে ডিভাইসটির ব্যবহার অভিজ্ঞতা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়তে থাকে।
অথচ ওই সময়ের কিছু আগেও কোম্পানিটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০০৯ সালে ফরচুনের দ্রুততম বর্ধনশীল ১০০ কোম্পানির তালিকায় প্রথম স্থান পায় আরআইএম। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টফোন বাজারে কোম্পানিটির হিস্যা ছিল ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে ব্ল্যাকবেরি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখের বেশি ছিল।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএসের জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বাজারে ব্ল্যাকবেরির অংশ কমতে শুরু করে। ২০১২ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্মার্টফোন বাজারে ব্ল্যাকবেরির হিস্যা নেমে আসে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে। বিপরীতে অ্যান্ড্রয়েডের হিস্যা ছিল ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আইওএসের ৩৫ শতাংশ।
শেয়ারবাজারেও ধাক্কা
বাজার হারানোর প্রভাব পড়ে কোম্পানিটির শেয়ারদরেও। ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্ল্যাকবেরির শেয়ারদর সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারে উঠেছিল। কিন্তু ২০১১ সালে সেটি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যায়।
২০১৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার লোকসানের তথ্য প্রকাশের পর একদিনেই কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।
ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য পরবর্তী সময়ে একাধিক উদ্যোগ নেয় ব্ল্যাকবেরি। নতুন সফটওয়্যার, টাচস্ক্রিন ডিভাইস এবং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে বাজারে ফেরার চেষ্টা করলেও সেগুলো প্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত স্মার্টফোনের বাজারে একসময় নেতৃত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি সেই ব্যবসা থেকেই সরে যায়। প্রযুক্তি বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারলে একটি সফল ব্র্যান্ডও কত দ্রুত পিছিয়ে পড়তে পারে—ব্ল্যাকবেরির উত্থান ও পতনের ইতিহাস তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।





















