গ্রিন এনার্জি সমাধানে এরই মধ্যে বহু কাজ হয়েছে। জ্বালানিপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় আমদানিনির্ভর হওয়ায় নবায়নযোগ্য উৎস বা বিকল্প প্রযুক্তিগত সমাধানের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সমাধানও রয়েছে। কিন্তু আমরা প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাকে সম্ভবত গুরুত্ব দিতে পারছি না। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এক্ষেত্রে সম্প্রতি একটি নতুন চমক দেখিয়েছে। দেশটির বেসরকারি জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিনভাইজ একটি চুলা তৈরি করেছে। এতে পাইপলাইন নেই, আগুন জ্বালাতে সিলিন্ডারও লাগে না। শুধু পানি থাকলেই চলে। গ্রিনভাইজ এ চুলার নাম দিয়েছে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে হাইড্রোজেন চুলা’। সামান্য একটু পানি ঢেলে সুইচ চাপলেই চুলার ভেতর জ্বালানি তৈরি হয়। মূলত ‘নব’ ঘোরালে পানিতে থাকা হাইড্রোজেন আলাদা হয় এবং এটিই মূলত জ্বালানি হিসেবে পোড়ে। চুলাটি এরই মধ্যে অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তিটিকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। অর্থাৎ নীতিপর্যায়ে সুস্পষ্ট সহযোগিতা ও উৎসাহ পাওয়ায় এ ধরনের বিকল্প উদ্ভাবন হচ্ছে। বাংলাদেশ এ উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় পরিসরেই এ ধরনের চুলা বানানোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
যদিও বলা হচ্ছে, এটি ভারতের উদ্ভাবন। কিন্তু বুঝতে হবে, প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন নয়। পানি থেকে জ্বালানি তৈরির কার্যক্রম সেই ১৯৬০ সালে সেফফ্লেম প্রজেক্টের মাধ্যমে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সচরাচর এ প্রযুক্তিকে ‘অক্সি-হাইড্রোজেন টর্চ’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে এটিকে প্রথাগত জ্বালানি কিংবা গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রেই মূলত এর ব্যবহার করা যায়। গ্রিনভাইজও জানিয়েছে, তারা মূলত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও যেসব স্থানে জীবাশ্ম জ্বালানি কিংবা বিদ্যুতের চাহিদাগত অভাব রয়েছে, সেসব জায়গায় এ চুলা বিক্রির পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে প্রোটোন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন (পিইএম) ইলেকট্রোলাইজার সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারি সংযোগ থাকায় ‘নব’ ঘুরালেই পানির অণু ইলেকট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ায় ভেঙে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন আলাদা হয়ে যায়। হাইড্রোজেন আগুনের উৎস আর অক্সিজেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। ফলে এটি ব্যয়সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব একটি প্রকৌশল। হাইড্রোজেন জ্বালানির বড় সুবিধা, এটি জ্বললেও কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় না, তাই ধোঁয়াও হয় না। চুলাটি ব্যয়সাশ্রয়ী, কারণ মাত্র এক ইউনিট (এক কিলোওয়াট) বিদ্যুৎ আর ১০০ মিলিলিটার পানি হলে প্রায় ৬ ঘণ্টা রান্না করা সম্ভব। এছাড়া আরেকটি সুবিধা হলো সৌরশক্তির সঙ্গে এর সংযোগ। সৌর জ্বালানি ব্যবহার করে দিনের বেলায় এ চুলা জ্বালানো সম্ভব। আবার রাতে ব্যাটারির সংযোগ থেকে আগুন পাওয়া যাবে। অর্থাৎ কেনার খরচ বাদে আগুনের জন্য আদতে বাড়তি ব্যয় নেই।
দেশে গ্যাস সংকট নতুন কিছু নয়, আবার নতুন সংযোগও বন্ধ। সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে। বিদ্যুতের দামও বাড়তি। এ বাস্তবতায় এ ধরনের প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিতে পারলে জ্বালানি সংকটের বিকল্প তৈরি করা কঠিন কিছু হবে না। যদিও এ প্রযুক্তি সাধারণ গৃহস্থালি কাজের জন্য উপযুক্ত, কিন্তু এর মূল্য সাধ্যের মধ্যে এখনো আসেনি। ভারতে উদ্ভাবিত এ চুলার এক স্টোভের ইউনিটের দাম ১ লাখ ১০ হাজার ভারতীয় রুপি। আর দুই স্টোভের চুলার মূল্য দেড় লাখ ভারতীয় রুপি। গ্রিনভাইজ জানিয়েছে, ধীরে ধীরে এর বিক্রি বাড়লে দাম কমবে। অর্থাৎ আমরাও দেশীয় পরিসরে এ ধরনের প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিলে তার মূল্য সাধারণ গৃহস্থালির ক্রয়সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে। তবে এটিকে বিলাসী প্রযুক্তি বলে অবহেলারও সুযোগ নেই। কারণ দেশে বাণিজ্যিক বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, স্বর্ণ ও কারিগরি খাতে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। গ্রিন এনার্জি অর্থনীতির দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে তাই উদাহরণটিকে আমরা বিবেচনা করতে পারি।
অক্সি-হাইড্রোজেন চুলার প্রযুক্তি জটিল নয়। দেশের প্রকৌশলীরা সহজেই এর সাশ্রয়ী মডেল তৈরি করতে পারবেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে। এ বিষয়ে প্রণোদনা ও উৎসাহ দিতে হবে সরকারকে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এর প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে গবেষণা করে দেশের জন্য সাশ্রয়ী এমন চুলা তৈরি করা যেতে পারে। প্রযুক্তিটিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়সাধ্যে আনার জন্য বারবার আধুনিকায়ন ও মডিফাইয়ের দিকে যেতে হবে। অর্থাৎ গ্রিন এনার্জি খাতে অর্থায়নের বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিলে জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা আস্তে আস্তে কমিয়ে আনতে পারব। তাছাড়া যখন প্রযুক্তির সম্ভাবনা নানামুখী হয়, তখন তার চাহিদা বহির্বিশ্বেও তৈরি হয়। সেটা রফতানি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
















