বাংলাদেশে ঈদ বা যেকোনো বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায়শই দেশের অভ্যন্তরে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্য অর্ডার করে থাকেন। কিন্তু দেশের শীর্ষস্থানীয় রিটেইল চেইন এবং নামী বৈভিক ব্র্যান্ডগুলোর দায়িত্বজ্ঞানহীন কাস্টমার সার্ভিসের কারণে সেই উৎসবের আনন্দ কীভাবে বিষাদে রূপ নিতে পারে, তার একটি বড় নজির সম্প্রতি সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র (USA) প্রবাসী জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিন রাফান দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘স্টার টেক লিমিটেড’ (Star Tech Ltd.) এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ‘ওয়ার্লপুল বাংলাদেশ’ (Whirlpool Bangladesh)-এর বিরুদ্ধে চরম অবহেলা ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। তবে প্রযুক্তি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘স্টার টেক’-এর বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানি ও ত্রুটিযুক্ত পণ্য বিক্রির এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়; এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নকল পণ্য বিক্রি ও ওয়ারেন্টির নামে মাসজুড়ে ক্রেতাদের ঘোরানোর একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
রবিন রাফানের বিবরণ অনুযায়ী, আসন্ন ঈদে নিজের বোনকে সারপ্রাইজ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনলাইনে স্টার টেকের মাধ্যমে ওয়ার্লপুলের একটি নতুন রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু ঈদের ঠিক আগের দিন ফ্রিজটি ব্যবহার করতে গিয়ে তার বোন দেখতে পান যে, এর নরমাল ফ্রিজার অংশটি একেবারেই কাজ করছে না। উৎসবের সময় নতুন একটি দামি ফ্রিজ ঘরে আনার পর যদি সেটি অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে, তবে একটি পরিবারের জন্য তা কতটা মানসিক যন্ত্রণা ও বিরক্তির কারণ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
ঈদের পর ওয়ার্লপুলের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করা হলে পর পর দুদিন প্রতিষ্ঠানটি থেকে দুজন টেকনিশিয়ান এসে ফ্রিজটি পরিদর্শন করেন। তারা দুজনেই নিশ্চিত করেন যে, একদম নতুন এই ফ্রিজটির মোটরটি নষ্ট এবং এটি পরিবর্তন বা মেরামত (Repair) করতে হবে।

তবে রবিন রাফান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “একদম নতুন একটি ফ্রিজ কিনে আমি শুরুতেই তা মেরামত করে নেব না। ত্রুটিযুক্ত পণ্য দেওয়ায় এটি দ্রুত পরিবর্তন (Replace) করে দিতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তীব্র গরম এবং ঈদের ছুটির মধ্যে ফ্রিজটি অকেজো থাকায় তার বোনের পরিবারের বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়েছে।
গ্রাহকের পক্ষ থেকে পণ্যটি দ্রুত পরিবর্তন করে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও ওয়ার্লপুল বা স্টার টেক কর্তৃপক্ষের কেউ এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ করেনি। তীব্র গরমের মধ্যে কাস্টমারের এই চরম দুর্ভোগের পরও কোম্পানি দুটির এমন নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা গ্রাহক সেবার নূন্যতম নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন।
চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিন রাফান বলেন, “এত অবহেলা একটা ক্লায়েন্টের প্রতি! কিছুই বলার নাই। আসলে বাংলাদেশে কারও কোনো দায়বদ্ধতা নাই। এই ঘটনা বাংলাদেশ বলেই সম্ভব। এত বড় ব্র্যান্ড দেখে প্রোডাক্ট কেনাটাই চরম ভুল ছিল।”
স্টার টেক লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়
রবিন রাফানের এই অভিজ্ঞতার পর স্টার টেকের বিরুদ্ধে অতীতে ঘটা একাধিক চরম হয়রানি ও জালিয়াতির চিত্র আবারও জনসমক্ষে চলে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বড় বড় কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে রয়েছে:
স্যামসাংয়ের নকল এসএসডি বিক্রি: দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি ব্র্যান্ড দাবি করলেও স্টার টেকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড স্যামসাংয়ের নকল সলিড স্টেট ড্রাইভ (SSD) বা স্টোরেজ ডিভাইস বিক্রি করার মতো মারাত্মক জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।
‘ওয়ারেন্টি’ নাটক ও মাসজুড়ে হয়রানি: স্টার টেকের তথাকথিত ‘ওয়ারেন্টি পলিসি’ নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ওয়ারেন্টির নামে মাসের পর মাস গ্রাহকদের ডেস্কে ডেস্কে ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কপাল পোড়ানোর এবং কোনো সমাধান না দেওয়ার নজির রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
মনিটর নিয়ে ভোগান্তি ও রিপ্লেসমেন্ট না পাওয়া: স্টার টেক থেকে মনিটর কেনার পর ত্রুটি ধরা পড়লেও ক্রেতাদের রিপ্লেসমেন্ট (Replacement) বা পণ্য পরিবর্তন করে না দেওয়ার একাধিক লিখিত অভিযোগ রয়েছে।
৯২ হাজার টাকার ল্যাপটপ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড: বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে স্টার টেক থেকে ল্যাপটপ কিনেও চরম তুঘলকি কাণ্ড ও অপেশাদার আচরণের মধ্য দিয়ে ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও আর্থিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক যদি অর্থ পরিশোধের পর ত্রুটিযুক্ত বা নষ্ট পণ্য পান, তবে ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি পলিসি অনুযায়ী তা অবিলম্বে পরিবর্তন (Replacement) বা সমমূল্যের অর্থ ফেরত (Refund) পাওয়ার আইনি অধিকার রাখেন। নতুন পণ্যে শুরুতেই যান্ত্রিক ত্রুটি থাকা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ (QC) প্রক্রিয়ার চরম দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।
নামী ব্র্যান্ডের সিলমোহর এবং ঝাঁ-চকচকে শোরুমের আড়ালে স্টার টেক লিমিটেডের মতো বড় রিটেইলাররা যদি বারবার গ্রাহকদের ত্রুটিযুক্ত বা নকল পণ্য সরবরাহ করে এবং বিক্রয়োত্তর সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা দেশের ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স ও রিটেইল খাতের জন্য এক বিরাট আস্থার সংকট তৈরি করবে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা এবং সাধারণ ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP)-এর এই বিষয়ে দ্রুত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।



















