চীনা কোম্পানিগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা রুখতে এবার আরও একধাপ কঠোর অবস্থান নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন চীনা সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে এনভিডিয়ার তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘ব্ল্যাকওয়েল’ প্রসেসরের মতো অত্যাধুনিক এআই চিপের রপ্তানি বন্ধ করতে আকস্মিক এক নির্দেশনা জারি করেছে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
রোববার ছুটির দিনে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি’ তাদের ওয়েবসাইটে এই বিশেষ নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যা চিপ বাজারে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ফাঁক গলে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিল লাখ লাখ চিপ
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সরকার এর আগে চীনের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি এআই চিপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও একটি বড় আইনি লুপহোল বা ফাঁকফোকর রেখে দিয়েছিল। এই ফাঁকটি ব্যবহার করে চীনা এআই কোম্পানিগুলোর বিদেশি শাখা বা সাবসিডিয়ারিগুলো (যেমন—মালয়েশিয়ায় অবস্থিত চীনা চিপ ডিজাইন হাউস বা ডেটা সেন্টার) কোনো ধরনের বিশেষ লাইসেন্স ছাড়াই মার্কিন চিপ জায়ান্ট এনভিডিয়া ও এএমডির কাছ থেকে সরাসরি চিপ কিনতে পারছিল।
ওয়াশিংটনে এই লুপহোল সংক্রান্ত একটি গোপন শ্বেতপত্র বা নথিপত্র ফাঁস হওয়ার পরপরই তড়িঘড়ি করে এই পদক্ষেপ নেয় মার্কিন প্রশাসন। ওই নথিতে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, “চিপ চুরির দ্বারটি গোপনে খুলে গেছে।” চিপস শিল্পের সরবরাহ চেইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন একজন অভ্যন্তরীণ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, গত এক বছরে এই আইনি ফাঁক গলে প্রায় কয়েক লাখ উচ্চক্ষমতার মার্কিন এআই চিপ চীনা কোম্পানিগুলোর বিদেশি থার্ড-পার্টি এজেন্টের হাতে পৌঁছে গেছে।
পেন্টাগনের পুরোনো নীতিতে সংশোধন
২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বাইডেন প্রশাসনের শেষ দিনগুলোতে জারি করা ‘এআই ডিফিউশন’ নীতিটি প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এই চিপ পাচারের সুযোগটি তৈরি হয়েছিল। ওই নীতিতে বিশ্বজুড়ে এআই চিপের অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণে কঠোর বাধ্যবাধকতা ছিল।
বিআইএসের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, “২০২৩ সাল থেকে কার্যকর থাকা রপ্তানি লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তাগুলো আরও স্পষ্ট করতেই এই নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল প্রযুক্তি সুরক্ষিত রাখতে আমরা এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে কার্যকর করে যাব।”
এনভিডিয়ার অবস্থান এবং আরেকটি বড় ঝুঁকি
এই নতুন নির্দেশনার বিষয়ে এনভিডিয়ার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নতুন কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগেই চিঠির মাধ্যমে এনভিডিয়াকে এই ধরনের স্পর্শকাতর চালানের ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএমডি অবশ্য এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা এবং প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিস ম্যাকগুয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, “এই নির্দেশিকা একটি ফাঁক বন্ধ করলেও আরেকটি বড় ঝুঁকি খোলা রেখে দিয়েছে। তাইওয়ানের টিএসএমসি বা অন্য চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো যে চিপ তৈরি করছে, তা কোনো চীনা ফ্রন্ট কোম্পানি বা ভুয়া ক্রেতার জন্য তৈরি হচ্ছে কি না—তা যাচাই করার জন্য যে বাড়তি তদন্ত বা ‘ডিউ ডিলিজেন্স’-এর প্রয়োজন ছিল, সেই বাধ্যবাধকতাটি এই নতুন নির্দেশিকায় রাখা হয়নি। ফলে ছদ্মনামে চিপ পাচারের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।”




















