“আমি ডেভিড ইমন বলতেছি, ব্যবসা-বাণিজ্য এখন থেকে আমরা করবো, আপনারা করিয়েন না। পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করেন আমি কে… আপনারা ১৭-১৮ বছর ব্যবসা করছেন, আর আমরা ৫ আগস্টের পর ১৭-১৮ টা মার্ডার মামলা নিয়ে ঘুরতেছি।”
চট্টগ্রাম নগরে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিককে ফোনে ঠিক এই ভাষাতেই হুমকি দিয়েছিল বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন। সেই হুমকি ও ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে অবশেষে দিনদুপুরে ওই করপোরেট অফিসে সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
গত সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া সড়কে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (DDN) কার্যালয়ে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে।
ডিডিএন-এর মালিক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, হামলার দুদিন আগে একটি বিদেশি নম্বর থেকে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে তার কাছে ফোন আসে। ফোনে ব্যবসা সচল রাখতে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ইমন নিজেকে চরম প্রভাবশালী দাবি করে বলেন, “পুলিশ কমিশনারকে আমার ছবি দেখালেই চিনতে পারবেন।”
শুধু তাই নয়, ব্যবসায়ীকে ভয় দেখাতে ইমন চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী ‘স্মার্ট গ্রুপ’-এর পরিচালকের বাসায় চাঁদা না পেয়ে গুলি চালানোর ঘটনাও উল্লেখ করে। অডিও কলে তাকে বলতে শোনা যায়, “মুরাদপুর, অক্সিজেন, হাটহাজারী সবাই আমাদের সাথে সমন্বয় করে ব্যবসা করতেছে… আপনি যদি ব্যবসা করেন তাহলে আমাদের সাথে কমিটমেন্ট করে ব্যবসা করেন, না হলে আর ব্যবসা করিয়েন না। দুইদিন টাইম দিলাম।”
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির জানান, চাঁদা না দেওয়ায় সোমবার দুপুরে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র দল হঠাৎ অফিসে ঢুকে তাণ্ডব শুরু করে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দেশীয় ও ধারালো অস্ত্রধারী কয়েকজন সন্ত্রাসী অফিসে ঢুকে কম্পিউটার, ওএলটি (OLT) ডিভাইস, রাউটার ও অন্যান্য মূল্যবান প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ভাঙচুর করছে। একজনকে কুড়াল দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে কম্পিউটার চুরমার করতে দেখা যায়। হামলার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কাউন্টারে থাকা কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য রক্ষিত প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
এই ঘটনার পর বন্দরনগরীর চকবাজার, বাকলিয়া ও কোতোয়ালি এলাকার ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও কর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ও স্থানীয় থানা পুলিশ জানিয়েছে, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর নেটওয়ার্ক। বর্তমানে সাজ্জাদের হয়ে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান নামের দুই সন্ত্রাসী মাঠপর্যায়ে এই চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
পুলিশের অপরাধী প্রোফাইল অনুযায়ী:
পরিচয়: মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায়।
মামলা: তিনি ২০২৫ সালের বাকলিয়ার বহুল আলোচিত জোড়া খুন এবং পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলাসহ অন্তত ৭টি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
অপরাধের ধরন: পুলিশ জানিয়েছে, ইমন অত্যন্ত অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ এবং দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পপতি ও আইটি ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন।
সাজ্জাদ ও ইমন বাহিনীর এই সন্ত্রাসী তৎপরতা চট্টগ্রামে নতুন নয়। এর আগে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি একই চক্র চাঁদা না পেয়ে বাকলিয়া এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে পরপর দুইবার পিস্তল দিয়ে গুলি চালিয়েছিল। এছাড়া গত ৯ মে চট্টগ্রামের এক স্থানীয় সাংবাদিককে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছিল এই ডেভিড ইমন।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর হোসেন মামুন গণমাধ্যমকে বলেন, “ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার সিসিটিভি ফুটেজ আমাদের হাতে এসেছে। ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকজন আসামিকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা গেছে। বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ এবং তার দেশীয় সহযোগীদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। এই বিষয়ে দ্রুত আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”



















