সরকারি বাঙলা কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হাফিজ। গত ৬ জুন দুপুরে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সুমিত দাশ হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি ইমরানকে জানান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে তাঁর নামে একটি সাইবার পিটিশন মামলা হয়েছে। সিটি ব্যাংকে তাঁর নামে একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে এবং ওই অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অ্যাকাউন্টটি খোলার সময় ইমরানের নামে থাকা একটি ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। মুহাম্মদ মনজুর মোর্শেদ নামের এক ব্যক্তি এই মামলাটি করেছেন বলে ফোনে জানানো হয়।
আচমকা এমন তথ্য শুনে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না ইমরান। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তাঁর নামে সিটি ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই এবং তিনি কখনো ওই ব্যাংকে যানওনি। এমনকি তাঁর নামে কোনো ট্রেড লাইসেন্স থাকারও প্রশ্ন ওঠে না। কথোপকথনের একপর্যায়ে নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি ইমরানকে চট্টগ্রামে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। এতে তাঁর সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। বিষয়টি প্রতারণামূলক ফোনকল মনে হওয়ায় তখন আর গুরুত্ব দেননি ইমরান এবং কাউকে বিষয়টি জানাননি। তবে প্রায় এক মাস পর, ১২ জুলাই আবারও অপরিচিত একটি নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে। এবার ফোনদাতা নিজেকে উত্তরা পূর্ব থানার এএসআই বুলবুল হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, ইমরানের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উত্তরা রানাভোলা এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান স্পষ্টভাবে জানান, তিনি কখনো ওই ঠিকানায় বসবাস করেননি, এমনকি সেখানে কখনো যানওনি।
১২ জুলাই এএসআই বুলবুলের ফোন পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন ইমরান এবং পরিবারকে জানান। এর তিন দিন পর, ১৫ জুলাই তদন্তের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট থানার এএসআই ফজলুল করিম ইমরানের সাতক্ষীরার স্থায়ী ঠিকানায় গেলে তিনি আরও দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। অসুস্থ ও কর্মক্ষমতাহীন বাবার সংসারে টিউশনি করে নিজের খরচ চালান ইমরান। এর মধ্যে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তাঁর স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে পরিবার। একপর্যায়ে বিষয়টি তিনি জানান। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন প্রতিবেদক। অনুসন্ধানের পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ইমরান সিটি ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে তাঁকে নিকটস্থ যেকোনো শাখায় গিয়ে এ বিষয়ে তথ্য নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী ১৬ জুলাই সিটি ব্যাংকের মিরপুর-১ শাখায় গেলে শাখা ব্যবস্থাপক যাচাই করে জানান, ইমরানের নামে ব্যাংকটিতে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। এতে বিষয়টি নিয়ে তাঁর বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে ইমরানের উপস্থিতি, অনুমতি ও পরিচয় যাচাই ছাড়া কীভাবে তাঁর নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হলো, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ই-মেইল করেন তিনি। ইমরান জানতে চান, কোন নথির ভিত্তিতে তাঁর নামে হিসাবটি খোলা হয়েছে, কীভাবে ‘Know Your Customer’ (KYC) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদনপত্র, পরিচয় যাচাই-সংক্রান্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড তদন্তের আওতায় আনা হবে কি না। পাশাপাশি ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবহেলা কিংবা সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান। জবাবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার কথা জানালেও ইমরনকে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবহেলা কিংবা সম্পৃক্ততা তদন্তে প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান ইমরান। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ২৬ জুলাই সিটি ব্যাংকের গুলশান-১ শাখার বিরুদ্ধে গুলশান মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। পরে ৩০ জুলাই তাঁর নামে থাকা ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মিরপুর শাহ আলী থানায় আরেকটি অভিযোগ দেন। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ার ও ই-মেইলে যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়ায় ব্যাংকটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন ইমরান।
মামলার আবেদনে যা বলা হয়েছে
মামলার বাদী মুহাম্মদ মনজুর মোর্শেদের অভিযোগ, ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে টেলিগ্রামে ‘@Noor_Alishal’ আইডি থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কাজ করে আয় এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখানো হয় তাকে। প্রতারকদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীসময়ে প্রতারকদের দেওয়া বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ নম্বরে ধাপে ধাপে মোট ৪২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৬ টাকা পাঠান। পরে আরও অর্থ বিনিয়োগের চাপ দেওয়া হলে তার সন্দেহ হয় এবং তিনি বুঝতে পারেন যে এটি একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারক চক্র।
পরে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন মনজুর মোর্শেদ। তদন্তের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে সংশ্লিষ্ট হিসাবধারীর পরিচয় ও লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চায়। এরপর তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে, কীভাবে ভুয়া তথ্য ও নথি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাবটি খোলা হয়েছিল এবং ওই হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন পরিচালিত হয়। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে মনজুর মোর্শেদ বলেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়ে মামলা করেছেন এবং বর্তমানে তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এক মাসেই ২৪ লাখ টাকার লেনদেন
ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল সিটি ব্যাংকের গুলশান-১৩০ শাখায় হিসাবটি খোলা হয়। ৯ এপ্রিল হিসাব অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ১৪ এপ্রিল থেকে লেনদেন শুরু হয়। একই মাসের ২৯ এপ্রিল বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। বড় অঙ্কের টাকা তাৎক্ষণিক ট্রান্সফার করার পদ্ধতি আরটিজিএস-এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে ১৯ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা মেসার্স এমএম ফারুকী এন্টারপ্রাইজ থেকে অ্যাকাউন্টে জমা হয়। পরে একই দিন ধাপে ধাপে ছয়টি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাৎক্ষণিক আন্তঃব্যাংক কার্ড ও অ্যাকাউন্ট লেনদেনে ব্যবহৃত এনপিএসবির মাধ্যমে সব টাকা তুলে নেওয়া হয়। পুরো এপ্রিল মাসে হিসাবটিতে মোট লেনদেন হয় ২৪ লাখ টাকার বেশি। অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে ফ্রিজ করা। এসব লেনদেনের মেইল বা মেসেজ কোনোটি ইমরান হাফিজের কাছে যায়নি। তার নামে ব্যবহৃত ভুয়া মোবাইলে কোনো মেসেজ গেছে কি না সেটা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আবেদনপত্রে যে তথ্য মিলেছে
হিসাব খোলার আবেদনপত্রে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। সেখানে দুটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি নম্বর ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবিরের। অন্য নম্বরটি (হিসাবধারী হিসেবে এ নম্বরটি দেওয়া) ট্রুকলার অ্যাপে মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সালাহ উদ্দিন আকনের নামে নিবন্ধিত দেখা যায়। হিসাব খোলার ফরমে ইমরানকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার মাসিক আয় উল্লেখ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। তার নামে একটি ট্রেড লাইসেন্সও আছে। বাস্তবে তিনি একজন কলেজ শিক্ষার্থী। কখনো ব্যবসা করেননি। টিউশনি করে তার মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকার মতো। ফরমে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ফাহাদ টেলিকম, ৪-এ, রানাভোলা, ১৫ নম্বর বাসা’। স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে জাতীয় পরিচপত্র অনুযায়ী।
ভুক্তভোগী ইমরান হাফিজের দাবি
ইমরান হাফিজ কাছে দাবি করেন, তিনি জীবনে কখনো সিটি ব্যাংকের কোনো শাখায় যাননি কিংবা কোনো ব্যাংক হিসাব খোলেননি। অথচ তার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে একের পর এক মিথ্যা তথ্য। হিসাব খোলার ফরমে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তার কোনোটিই সঠিক নয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ইমরান হাফিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থেকে তার মুখের ছবি সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে টাই-কোট পরিহিত একটি নতুন ছবি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে এনআইডিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে বাস্তব স্বাক্ষরের কোনোভাবেই মিল নেই। এছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের যে ঠিকানা বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে তিনি কখনো যাননি বা চেনেন না বলে দাবি ইমরানের। আর ট্রেড লাইসেন্সে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি কলেজের বিভিন্ন কাজে এবং এক বন্ধুকে ই-লার্নার করতে দেওয়া ছাড়া কাউকে কখনো দেননি।
অ্যাকাউন্ট ইমরানের, মোবাইল নম্বর মাদারীপুরের শিক্ষকের
সিটি ব্যাংকের ফরমে দুটি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি নম্বর ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবিরের। আরেকটি নম্বর (যেটি হিসাবধারীর নম্বর হিসেবে ব্যবহৃত) মাদারীপুরের একজন শিক্ষকের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের রিটেইল কর্মকর্তা রেজাউল কবির বলেন, ‘অ্যাকাউন্টটি আমি করেছি। তাই আমার নম্বর দেওয়া আছে। ইমরান হাফিজ আমার ক্লায়েন্ট। তিনিই এসে স্বাক্ষর করেছেন এবং চেকবই নিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাতে পারবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রাহক এসেছিলেন বলেই হিসাব খুলেছি। তখন এমন কোনো জটিলতার বিষয় বুঝতে পারিনি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ট্রুকলারে পাওয়া নাম ধরে অন্য নম্বরটি মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বীরমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সালাহ্ উদ্দিন আকনের বলে নিশ্চিত হয়। এলাকায় খোঁজ নিয়েও তার নাম-পরিচয় সঠিক বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে এ বিষয়ে সালাহ্ উদ্দিন আকন বলেন, ‘আমি ইমরান হাফিজ নামে কাউকে চিনি না। কিছুদিন আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তদন্তের স্বার্থে আমাকে ফোন করা হয়েছিল। তখন বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এখন আপনার কাছ থেকেই জানতে পারলাম, আমার নম্বর ব্যবহার করে একটি ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। আমি এ প্রতারক চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
ইমরানের বাড়ি সাতক্ষীরা, নমিনি তার ‘আন্টি’ থাকেন গাইবান্ধা
ব্যাংক হিসাবে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ফেনসি আক্তারকে নমিনি দেখানো হয়েছে। তাকে ইমরান হাফিজের ‘আন্টি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। ইমরান হাফিজ জানান, তিনি কখনো ফেনসি আক্তারকে চেনেন না। এমনকি মো. সালাহ্ উদ্দিন আকনও তাদের কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। দুজনের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে ও একজনের এলাকায় খোঁজ নিয়ে এ তথ্যের সত্যতা মিলেছে। নমিনির সঙ্গে হিসাবধারীর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবিনমিনির সঙ্গে হিসাবধারীর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি
নমিনি ফেনসি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে জানা যায় তার বাড়ি গাইবান্ধা। ফেনসির খোঁজে পাড়ি জমায় ফেনসির বাড়ি গাইবান্ধার ফুলছড়ির ঝাঞ্জার কানঝইড় গ্রামে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা ঠিকানায় ফেনসিকে পাওয়া যায়নি। তার বাবার নাম উল্লেখ আছে মো. শাজাহান। পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নদীভাঙনে তাদের ভিটামাটি হারালে এলাকা ছেড়ে চলে যান। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। ফুলছড়ি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য (ঝাঞ্জার কানঝইড়) বেলাল হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘নদীভাঙনে ফেন্সি আক্তারের পরিবারের ঘর-বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে তারা কাজের সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে যায়। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার আত্মীয়-স্বজনের কারও যোগাযোগ নেই বলে জানি।’
বর্তমান ঠিকানা ‘ভুয়া’, ‘অস্তিত্বহীন’ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান
হিসাব খোলার নথিতে ইমরান হাফিজের বাসা ও ব্যবসার ঠিকানা হিসেবে উত্তরার রানাভোলা এলাকার বিভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ফাহাদ টেলিকম, ৪-এ, রানাভোলা, ১৫ নম্বর বাসা’। রানা ভোলার বাসার ঠিকানা যেটি দেওয়া তার অস্তিত্ব নেই, এই বাসাই ওই সড়কের শেষরানা ভোলার বাসার ঠিকানা যেটি দেওয়া তার অস্তিত্ব নেই, এই বাসাই ওই সড়কের শেষ এ ঠিকানায় আসলে এই নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে কি না তা জানতেও অনুসন্ধান চালায়। সরেজমিনে উত্তরা গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় ‘৪-এ’ নামে কোনো সড়ক নেই। তবে ৪ নম্বর সড়ক থাকলেও সেখানে ১৫ নম্বর কোনো বাসা নেই। এছাড়া ‘ফাহাদ টেলিকম’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সড়কটির সবশেষ বাড়ি নম্বর ১২। এর পরই রাস্তা শেষ হয়ে গেছে।
১৬ নম্বর রোড রানাভোলায় না থাকলেও পাশে কামারপাড়ায় পাশে১৬ নম্বর রোড রানাভোলায় না থাকলেও পাশে কামারপাড়ায় পাশে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রানাভোলার ৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর বাসা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৬ নম্বর সড়কটি আসলে ১০ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। ওই বাসার নিচের দোকানি ও ভাড়াটিয়া সোহাইব জানান, সেখানে ইমরান হাফিজ নামে কোনো ব্যক্তি কখনো বসবাস করেননি। বাড়ির মালিকও একই তথ্য নিশ্চিত করেন।
ই-ট্রেড লাইসেন্স খুলেও প্রতারণা
ইমরান হাফিজের অজান্তেই ২০২৪ সালের ১১ জুলাই তাঁর নামে একটি ই-ট্রেড লাইসেন্স খোলা হয়। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফাহাদ টেলিকম’, যার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, ট্রেড লাইসেন্স নিতে ব্যক্তির সশরীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। প্রতারকরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্সে রানাভোলা ৪ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হলেও ওই সড়কে ১২ নম্বর পর্যন্ত বাড়ি রয়েছে। আবার মালিকের বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার জালালপুর। অথচ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ঢাকার ঠিকানা। ট্রেড লাইসেন্সে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও ইমরানের নয়। এ বিষয়ে ইমরান জানান, জীবনে তিনি কখনো সুনামগঞ্জে যাননি। তাঁর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় এবং প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি ঢাকার মিরপুরে বসবাস করছেন।
রানাভোলা ৪ নম্বর রোডের ১২ নম্বর পর্যন্ত বাসা আছে, ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবহার করা হয়েছে ১৬ নম্বররানাভোলা ৪ নম্বর রোডের ১২ নম্বর পর্যন্ত বাসা আছে, ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবহার করা হয়েছে ১৬ নম্বর সিটি ব্যাংকে জমা দেওয়া ট্রেড লাইসেন্সের কপিতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে হাতে লেখা একটি প্রত্যয়ন রয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমি ফিজিক্যালি কাস্টমারের কাছ থেকে সব ডকুমেন্টস ও কাস্টমারের অথেনটিক ই-ট্রেড লাইসেন্সের অরিজিনাল কপি দেখে সংগ্রহ করেছি।’
ভুয়া ট্রেড লাইসেন্সভুয়া ট্রেড লাইসেন্স
এ প্রত্যয়নে টিম লিডার রাহেল ইসলাম, ডেপুটি ইউনিট হেড মো. সালেহ উদ্দিন এবং টিপিএমও মো. রেজাউল কবিরের স্বাক্ষর রয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিনের মতামত জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে গত ২১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে তিনি সিন করলেও কোনো মন্তব্য করেননি। পরে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় ফোন দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মিলছে না
একজন ব্যক্তি উপস্থিত না থাকলে তার নামে কীভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হলো? হিসাব খোলার সময় পরিচয় যাচাই, মোবাইল নম্বর যাচাই ও প্রয়োজনীয় KYC প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছিল? ব্যবহৃত ট্রেড লাইসেন্স, ছবি, স্বাক্ষর ও অন্য নথি যাচাইয়ে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়েনি কেন? নাকি এটি পরিচয় চুরির একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, অথবা এর পেছনে আরও বড় কোনো প্রতারণার নেটওয়ার্ক কাজ করেছে?
প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা পেল
ঘটনাটি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তাধীন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে সাইবার পিটিশন মামলা নং-২৩/২০২৫ দায়ের হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। আমরা ইমরান হাফিজের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছি। তবে হিসাব খোলার ফরমে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সেখানে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তদন্তে আমরা যেটুকু পেয়েছি, সেটিই প্রতিবেদনে উল্লেখ করবো।-এএসআই বুলবুল তদন্তের স্বার্থে সিএমপি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবধারীর পরিচিতি ও ১ মার্চ ২০২৫ থেকে ৩০ মে ২০২৫ পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জয়। অন্যদিকে, ব্যাংক হিসাবে ব্যবহৃত ঠিকানা উত্তরার হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ছায়া তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট থানা। এ তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বুলবুল। ইমরান হাফিজের স্থায়ী ঠিকানাতেও ছায়া তদন্ত করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার এএসআই ফজলুল করিম জানান, গত ১৬ জুলাই ইমরানের গ্রামের বাড়ি স্বরাব্দীপুরে গিয়ে তাঁর ঠিকানা ও স্থানীয় পরিচয় সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয়। তিনি বলেন, সাইবার ক্রাইমের মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ইমরানের ঠিকানা সঠিক কি না এবং স্থানীয়ভাবে তাঁর সম্পর্কে কী ধরনের তথ্য পাওয়া যায়, তা যাচাই করাই ছিল তাঁদের দায়িত্ব। স্থানীয়রা ইমরানকে ভালো ছেলে হিসেবে জানিয়েছেন। তবে তাঁর কোনো আর্থিক লেনদেন বা গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। মামলার মূল তদন্তের বিষয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটই বিস্তারিত বলতে পারবে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন (সিএমপি) পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘যে কোনো ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে সাইবার অপরাধের ঘটনাগুলো সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়, আর আমলযোগ্য (কগনিজেবল) অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যদি ইতোমধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়, তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করবেন। তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ ও অভিযুক্তকে শনাক্ত করা গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে প্রসিকিউশন করা হবে।’
জাল নথি ব্যবহারের শাস্তি যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান ডালিম বলেন, অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, স্বাক্ষর জাল করা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নথি জাল করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৭ ধারায় এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। এ ধারায় মূল্যবান দলিল বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জালিয়াতির ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, জাল নথি আসল হিসেবে ব্যবহার করা হলে ৪৭১ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে। আর কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বিশ্বাসভঙ্গ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে পরিস্থিতি অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় মামলা হতে পারে, যেখানে যাবজ্জীবন বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি ফরেনসিকভাবে স্বাক্ষর পরীক্ষা এবং ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
‘ব্যাংকের ওপর আস্থা হারাবে গ্রাহক’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস বলেন, অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা করা গুরুতর অপরাধ। তবে শুধু কোনো অ্যাকাউন্টে বড় অংকের লেনদেন দেখেই কাউকে অপরাধী বলা উচিত নয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই সত্য বের করতে হবে। তবে ভুয়া হিসাবের এমন ঘটনায় ব্যাংক ইমেজ সংকটে পড়বে। গ্রাহকেরও আস্থা হারানোর আশঙ্কা আছে।
‘গ্রাহকের অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা ফৌজদারি অপরাধ’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কারও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তার অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা একটি মারাত্মক অপরাধ ও জালিয়াতি। এটি কেবল ব্যাংক বা গ্রাহকের বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি ফৌজদারি অপরাধ (ক্রিমিনাল কেস)।’ এটি দুই উদ্দেশ্যে হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, হয় অ্যাকাউন্টে অবৈধ লেনদেন ও জালিয়াতি করা, অথবা ওই নির্দোষ ব্যক্তি বা শিক্ষার্থীকে বিপদে ফেলা। এটি একটি গুরুতর অপরাধ এবং শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে নয়, এটি দেশের আইন অনুযায়ী একটি ফৌজদারি মামলা হিসেবে বিবেচ্য।’
ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে (এফআইসিএসডি) সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন। এছাড়া গভর্নর বরাবর লিখিত অভিযোগের মাধ্যমেও প্রতিকার চাওয়া সম্ভব বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র। ইমরান হাফিজ লিখিত অভিযোগ জানানোর সপ্তাহখানেক পর আরিফ হোসেন খানের কাছে অগ্রগতি জানতে চাইলে বলেন, যে কোনো অভিযোগ দেওয়ার পরই আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেটা নিয়ে কাজ শুরু করে। ইমরান হাফিজের অভিযোগের বিষয়েও একই।তিনি এ বিষয়ে এর বেশিকিছু বলেননি।
‘ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে হিসাব খোলা সম্ভব নয়’
ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা বা আর্থিক জালিয়াতি দাপ্তরিক নিয়মের লঙ্ঘন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব নয়। কারও এনআইডি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নয়, এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।-আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা এ বিষয়ে আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা বা আর্থিক জালিয়াতি দাপ্তরিক নিয়মের লঙ্ঘন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব নয়। কারও এনআইডি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার নয়, এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাই ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ যাচাই ব্যবস্থা আরও কঠোর করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধিত ভোটারসহ বিপুলসংখ্যক এনআইডি তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইট, ক্যাবিনেট ও সামরিক-সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল তথ্য এবং পরিচয়পত্রের তথ্যও সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবার সার্ভার বা ডোমেইনে হামলার জন্য ডার্ক ওয়েবে ম্যালওয়্যার ও পেলোড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবার সঙ্গে এসব কার্ড যুক্ত করার আগে সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সন্দেহজনক লেনদেন পরিচালনা এবং এর জেরে সম্পূর্ণ নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি—এ ধরনের বহুমাত্রিক অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, তথ্য ফাঁসের সুযোগ করে দিয়ে যারা লাভবান হয়েছেন এবং অ্যাকাউন্ট খোলার সময় গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ ও তার নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ে ব্যর্থ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ—কেউই দায় এড়াতে পারে না। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, একজন কলেজ শিক্ষার্থীর নামে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খুলে লাখ লাখ টাকার লেনদেনের ঘটনা শুধু প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার KYC প্রক্রিয়া, ব্যক্তিগত পরিচয় সুরক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।






















