বাংলাদেশে ঈদুল আজহা মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল। প্রতিবছর কোরবানির ঈদের আগে রাজধানী ঢাকা থেকে কোটি মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছুটে যান প্রিয়জনের কাছে। শুধু ঢাকা নয়, অন্য বড় শহর থেকেও মানুষ ছুটে যায় গ্রামে। কয়েক দিনের এই যাত্রা শুধু আবেগের নয়, এটি দেশের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ জনস্রোতও। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা অনেক সময় পরিণত হয় দুর্ভোগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট সংকট, সড়কে বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায় পথে।
বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কারণ এই সময় শুধু যাত্রীবাহী যানবাহনই নয়, সারা দেশে কোরবানির পশু পরিবহনও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাকভর্তি গরু, ছাগল ও অন্যান্য পশু রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে আসে। একই সময়ে যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, পণ্যবাহী ট্রাক-সবকিছু একসঙ্গে সড়কে নামায় চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসানো হয়, যা যান চলাচলে আরও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কোথাও কোথাও পশুবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় সড়কের একটি বড় অংশ দখল হয়ে যায়। ফলে সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। পরিবার নিয়ে যাত্রা করা নারী, শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে অনেকে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। আবার অতিরিক্ত চাপের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, যাত্রী ওঠানামার অনিয়ম, সড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং কিংবা বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণেও যানজট দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অবশ্য এরই মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন গত কয়েক বছরে ঈদযাত্রাকে অনেকটাই স্বস্তিদায়ক করেছে, সেটা অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা। আগে ঈদের টিকিট পাওয়া ছিল সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের যুদ্ধ। বাস কাউন্টার বা রেলস্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট পাওয়া যেত না। একদিন আগে কিংবা ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়ানো, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত টাকা দিয়ে টিকিট কেনা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক সময় টিকিট সংগ্রহ করতেই মানুষের একদিন বা তার বেশি সময় নষ্ট হয়ে যেত।
এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। অনলাইনভিত্তিক টিকিটিং চালু হওয়ায় মানুষ ঘরে বসেই স্মার্টফোন ব্যবহার করে বাস ও ট্রেনের টিকিট কাটতে পারছেন। এতে যেমন সময় বাঁচছে, তেমনি কমেছে ভোগান্তিও। স্টেশন বা টার্মিনালগুলোতে আগের মতো বিশৃঙ্খল ভিড় আর দেখা যায় না। টিকিট কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বেড়েছে, দালালচক্রের প্রভাবও অনেকাংশে কমেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও কর্মজীবী মানুষদের জন্য এটি বড় স্বস্তি তৈরি করেছে। অবশ্য এখনও টিকিট প্রাস্তিতে যে অভিযোগ নেই, তা নয়। সেটা হয়তো পুরোপুরি শেষ হতে আরও সময় লাগবে। কারণ, এক সঙ্গে এতো বেশি মানুষের টিকিট চাহিদা থাকে যে সে তুলনায় যানবাহন স্বল্পতা একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেটাও সড়কে ব্যবস্থাপনা ঠিক করা গেলে হয়তো উতরে ওঠা সম্ভব।
তবে শুধু টিকিট ব্যবস্থাপনা সহজ হলেই ঈদযাত্রার সামগ্রিক দুর্ভোগ কমবে না। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর সড়ক ব্যবস্থাপনা। প্রথমত, ঈদের সময় মহাসড়কের পাশে কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একেবারে পাশে হাট বসানো বন্ধ করতে হবে এবং বিকল্প জায়গা নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পশুবাহী যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে, যাতে যাত্রীবাহী যান চলাচল ব্যাহত না হয়।
তৃতীয়ত, সড়কে দায়িত্ব পালনকারী সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। ট্রাফিক পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, স্থানীয় প্রশাসন এবং হাইওয়ে কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। অনেক সময় দেখা যায়, ছোট একটি দুর্ঘটনা বা গাড়ি বিকল হওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এজন্য জরুরি সেবা ও উদ্ধার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে তার আশপাশে জরুরি সেবা প্রাপ্তি সহজ করতে হবে।
এ ছাড়া বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোর আশপাশে শৃঙ্খলা বজায় রাখাও জরুরি। যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং বন্ধে কঠোর নজরদারি দরকার। একই সঙ্গে যাত্রাপথে বিশ্রামকেন্দ্র, পর্যাপ্ত টয়লেট ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে, যাতে দীর্ঘ যাত্রায় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঈদযাত্রাকে শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি দেশের অর্থনীতি, নগরব্যবস্থা ও জনপরিবহন কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গণপরিবহন উন্নয়ন, রেলসেবার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ঈদ মানুষের আনন্দের উৎসব। সেই আনন্দ যেন পথে নষ্ট না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। অনলাইন টিকিটিং যেমন মানুষের ভোগান্তি কমিয়েছে, তেমনি সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে ঈদযাত্রাও হতে পারে আরও নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মানবিক।
লেখক: ইমরান হোসেন মিলন, যোগাযোগ ও মিডিয়া কর্মী।





















