‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ পাস হয়েছে। ১০ এপ্রিল শুক্রবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বিলটি উত্থাপন করেন।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বিলটি সংসদ সদস্যদের সামনে পেশ কর করলে তা সর্বস্মতিক্রমে কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর ফলে সাইবার স্পেসে অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও দমনসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই নতুন এই আইনের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ বাতিল হলো।
অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার পর সাবেকর প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫; সাইবার সুরক্ষা (সংশোধনী) অধ্যাদেশ, ২০২৫; ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫; ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা (সংশোধনী) অধ্যাদেশ, ২০২৬; জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫; এবং টেলিযোগাযোগ সংশোধনী অধ্যাদেশ, ২০২৬- এই ছয়টি অধ্যাদেশ, (চারটি আইন) জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। যদিও কিছু আইনে বেশ কিছু কম্প্রমাইজ করা হয়েছে। ডেটা নিয়ে মেগা পর্যায়ের অসংখ্য জালিয়াতির পরেও ক্রিমিনাল অফেন্স তুলে দেয়া হয়েছে প্ল্যাটফর্মের চাপে, আবার টেলিকম আইনের সার্ভেইলেন্স ধারায় এজেন্সি গুলোর এক্সেস ওপেন করা হয়েছে, তথাপি দেশের আইসিটি, টেলিকম ও ডেটা গভর্নেন্স-এ এই আইন গুলো শৃঙ্খলা আনবে।
তিনি বলেন, আজকে থেকে দেশের আইনে আপনার ব্যক্তিগত উপাত্ত আপনার সম্পদ। আপনার সম্মতি ছাড়া আপনার উপাত্ত কেউ ধারণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত ইত্যাদি করতে পারবে না। কোনও ব্যক্তিও না, কোম্পানিও না। শিশুদের ডেটা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে মডেলিং বা এআই ট্রেইন করা অপরাধ। ডেটা ওউনার হিসেবে নাগরিক প্রক্রিয়াজাতকৃত ডেটাতে এক্সেস চাইতে পারবেন। বাংলাদেশের ব্যাপক পরিসরে ডেটা জালিয়াতি, সাইবার ক্রাইম, ফাইনান্সিয়াল স্ক্যাম এবং আইডি জালিয়াতির প্রেক্ষিতে, উপাত্ত অধ্যাদেশে আমরা বাল্ক পরিমাণে ব্যক্তিগত উপাত্তের গপোনীয়তা লঙ্ঘনকে ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে রেখেছিলাম, সেটা আইনে আসেনি, বিএনপি সরকার তা সরিয়ে দিয়েছে। এখন আদালতকে এসব বিষয়ে লিটারেট হবে হবে, যাতে ব্যক্তিগত উপাত্তের গোপনীয়তার লঙ্ঘনকে অতি উচ্চ আর্থিক জরিমানার আওতায় আনা হয়।
ফয়েজ তৈয়্যবের ভাষায়, এখন থেকে ব্যক্তিগত উপাত্তের গোপনীয়তা লঙ্ঘনে, প্ল্যাটফর্মের ডেটা ব্রেচে, কোম্পানির ডেটা জালিয়াতিতে মামলা করা যাবে। এহেন কাজে সরকারের বিরুদ্ধেও মামলা করা যাবে। ব্যক্তি, কোম্পানি ও সরকার উভয়ে উপাত্ত সুরক্ষার প্রটেকশন সিক করতে পারবেন, আদালতে যেতে পারবেন। একই সাথে ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ সংরক্ষণ বিপণন এবং শেয়ারিং এ তাদের দায়িত্বও বাড়ালো। টেলিকম আইনের নজরদারির ধারায় বেশকিছু চেক এন্ড ব্যালান্স এসেছে, এবং আমরা ইন্টারনেট বন্ধ করা নিষিদ্ধ করতে পেরেছি।
‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন পাশ হওয়ার সরকারকে এখন ন্যাশনাল ডেটা অথরিটি করতে হবে। ফলে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার করার আইনি ম্যান্ডেট তৈরি হল অর্থাৎ ন্যাশনাল ইন্টার অপারেবিলিটি এবং কানেক্টিভিটি হাইওয়ে তৈরির পথ সুগম হবে। এর মাধ্যমে ওয়ান আইডি বাস্তবান করা যাবে, অর্থাৎ ডেটা গভর্নেন্স, ইন্টারঅপারেবিলিটি, ইলেকট্রনিক আইডি ম্যানেজমেন্ট- এই দিন লেয়ারের ন্যাশনাল ডিপিআই করার পথ সুগম হলো’- বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে একই অধিবেশনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় ২০টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে সকালের অধিবেশনে ১০টি বিল পাস হয়। কোনো বিলে দফাওয়ারি সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় এবং কোনো আলোচনা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রস্তাবের পর সর্বসম্মতিক্রমে বিলগুলো পাস হয়।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটি এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে। কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রাখা এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি অধ্যাদেশ আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে সংসদে আনার সুপারিশ করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ২০টি বিল পাস করা হলো।
আজকের অধিবেশনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করলে তা পাস হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল’ পাসের প্রস্তাব করেন।
অন্যান্য বিলের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও রংপুর) সংক্রান্ত বিল, আমানত সুরক্ষা বিল, গ্রামীণ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন বিল, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন বিল। বিলগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা পৃথকভাবে উত্থাপন করেন।



















